অনিমেষ দত্ত
গত বছর ভারতের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার পুলিশকর্মী তামিলনাড়ুর কে প্রীতিকা ইয়াশিনি সন্তান দত্তক নেওয়ার জন্য সেন্ট্রাল অ্যাডপশন রিসোর্স অথরিটি (কারা)–র কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এরপরে প্রীতিকা মাদ্রাজ হাইকোর্টে মামলা করেন। সেই মামলাতেও তাঁর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। কেন? কারা-র ২০২২-এর রেগুলেশনে তৃতীয় লিঙ্গের (এলজিবিটিকিউ+) মানুষদের সন্তান দত্তক নেওয়ার অধিকারই দেওয়া হয়নি!
এটি একটি উদাহরণমাত্র। ইচ্ছে থাকলেও অ্যাডপশন বা দত্তক নেওয়ার পদ্ধতি এবং নিয়মের বেড়াজালে আটকে পেরেন্ট বা অভিভাবক হতে পারেন না অসংখ্য ট্রান্সজেন্ডার মানুষ। তাই এ বার তাঁরা দত্তক নেওয়ার পদ্ধতি এবং নিয়মে ব্যাপক রদবদল চেয়েছেন। সম্প্রতি কারা-র তরফে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। তাতে ২০২২-এর অ্যাডপশন রেগুলেশন বা দত্তকের অধিনিয়মগুলিতে বদল আনার জন্য গোটা দেশ থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। সেই বিজ্ঞপ্তির রেসপন্সে পশ্চিমবঙ্গের ২০টি ট্রান্স সংগঠন একত্রে গুচ্ছ প্রস্তাব সম্বলিত একটি চিঠি দিয়েছে।
কারা-র নিয়ম অনুযায়ী, সন্তান দত্তক নিতে গেলে অন্তত দুই বছরের ‘স্টেবল ম্যারিটাল’ সম্পর্ক থাকতে হবে। যেহেতু ট্রান্স মানুষদের বিয়ের অধিকারই নেই, তাই তাঁরা সন্তান নেওয়ার জন্য ‘এলিজিবল’ হিসেবে গণ্য হন না। সংগঠনগুলির পক্ষে প্লেক্সাস ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের আইনজীবী এবং ক্যুইয়ার অ্যাক্টিভিস্ট সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘কোনও ট্রান্স কাপলের যদি দু’বছরের স্টেবল সম্পর্ক থাকে, তা হলে তাঁরা কেন বাচ্চা দত্তক নিতে পারবেন না? আমাদের প্রস্তাব, বৈবাহিক বা ম্যারিটাল শব্দটি সরিয়ে শুধু স্টেবল রিলেশনশিপ শব্দ দু’টি রাখা হোক।’
কারা-র ‘কেয়ারিং’ নামে একটি পোর্টাল রয়েছে। তাতে দত্তক নেওয়ার জন্য পেরেন্টদের নিজেদের যাবতীয় তথ্য নথিভুক্ত করতে হয়। সেখানে মেল এবং ফিমেল ক্যাটিগরি থাকলেও থার্ড জেন্ডার কিংবা আদার্স বলে কোনও ক্যাটিগরি রাখা হয়নি। ২০১৪-র শীর্ষ আদালতের ঐতিহাসিক ‘নালসা জাজমেন্ট’ স্মরণ করিয়ে সব্যসাচী বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট ওই রায়ে স্পষ্ট আদেশ দিয়েছিল, সমস্ত সরকারি কাজে মেল, ফিমেলের পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের ক্যাটিগরি রাখতে হবে। কারা-র পোর্টালে তা থাকবে না কেন?’
নিয়ম অনুযায়ী, সিঙ্গল মা মেল কিংবা ফিমেল চাইল্ড দত্তক নিতে পারেন। কিন্তু সিঙ্গল বাবা শুধুমাত্র পুত্র সন্তান দত্তক নেওয়ার জন্য এলিজিবল। কোচবিহারের ‘মৈত্রীসংযোগ সোসাইটি’র সম্পাদক সুমি দাসের প্রশ্ন, ‘এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের তথাকথিত মেল বা ফিমেল হিসেবে চিহ্নিত করেন না। অনেক গে-কাপলও রয়েছে। তাঁদের ক্ষেত্রে এমন ভেদাভেদ করা হবে কেন?’ তাঁর প্রশ্ন, ‘বাচ্চা তো বাচ্চাই হয়। তাকে সঠিক ভাবে মানুষ করাটাই আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয় কি?’
বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, কোনও বায়োলজিকাল পুরুষ নিজেকে ফিমেল হিসেবে চিহ্নিত করে (কিংবা উল্টোটা) নাম, লিঙ্গ ইত্যাদি পরিবর্তন করেন। তাঁর ক্ষেত্রেও সন্তান দত্তক নেওয়ায় বাধা সৃষ্টি হয়েছে। কী ভাবে?
কলকাতার নাগেরবাজারের সংগঠন ‘টিসার’-এর প্রতিষ্ঠাতা রাহুল মিত্রর ব্যাখ্যা, ‘ধরা যাক আমার নাম আগে মিতা ছিল। আমি বায়োলজিকালি ফিমেল। কিন্তু নিজেকে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করি। এ বার আমি কোর্টে এফিডেভিট করে নাম বদলে রাহুল রাখলাম। সে ক্ষেত্রে ভোটার, আধার-সহ যাবতীয় নথিতে নাম, লিঙ্গ পরিবর্তন হয় ধাপে ধাপে। এর মধ্যে দত্তকের জন্য আবেদন জানালে ভেরিফিকেশনের সময়ে অসঙ্গতি থেকে যায়। ফলে আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এমনটা হয়েওছে।’ তাঁর মতে, ‘এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি অযথা জটিল না-করে নোটারির মাধ্যমে সেল্ফ ডিক্লারেশন ব্যবস্থা রাখলে আর অসুবিধেই হবে না। এই ধরনের অসঙ্গতির কারণ দেখিয়ে আবেদন খারিজ করাও বাঞ্ছনীয় নয়।’ এমন বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছে ওই চিঠিতে।
উল্লেখ্য, ২০২৩-এ ম্যারেজ ইকুয়ালিটি নিয়ে একটি মামলা হয় সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলায় এই প্রসঙ্গগুলি উত্থাপিত হয়েছিল। তখন সুপ্রিম কোর্ট গে ম্যারেজ-কে আইনি বৈধতা দিতে অস্বীকার করে। এ বছর মার্চে কেন্দ্রীয় সরকারের আনা ‘দ্য ট্রান্সজেন্ডার পারসনস (প্রোটেকশন অফ রাইটস) অ্যামেডমেন্ট বিল ২০২৬’ পাশ হয় লোকসভা এবং রাজ্যসভায়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পরে সেটি আইনে পরিণত হয়। যা নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই।
এই আইন অনুযায়ী, নিজের ইচ্ছায় লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ করা যাবে না। মেডিক্যাল বোর্ড সেটা নির্ধারণ করবে। এই আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলাও হয়েছে। কে ট্রান্সজেন্ডার, কে নন — এ নিয়েই যখন ধোঁয়াশা, তখন সন্তান দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে কারা এলজিবিটি+ কমিউনিটিকে অধিকার দেবে কি না, তা সময়ই বলবে।