• 'ডুব দে রে মন মোবাইলে!' রিংটোনে নানা মত স্কুলেও
    এই সময় | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: স্কুল পড়ুয়াদের অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি কিছু পরামর্শও দিয়েছেন আর তা নিয়ে শুরু হয়েছে চর্চা। স্কুল এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একটি অংশ যেমন মুখ্যমন্ত্রীকে সমর্থন জানাচ্ছেন, অন্য একটি অংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে মোবাইল ফোনকে ব্রাত্য করা বোকামি।

    বর্ধমানের বেশ কিছু স্কুল এই বিষয়ে সেমিনার এবং সচেতনতা শিবির করার কথা ভাবছে। তালিত গৌড়েশ্বর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক নিখিলকুমার খাঁ মনে করেন, 'অভিভাবকদের অনুরোধ করব মোবাইল ফোন থেকে সন্তানদের দূরে রাখুন। মুখ্যমন্ত্রীর পদক্ষেপ সদর্থক। আমাদের স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের মোবাইল ফোন আনা নিষিদ্ধ। কোনও ছাত্র বা ছাত্রী মোবাইল ফোন সমেত ধরা পড়লে আমরা তা নিয়ে নিই। অভিভাবকদের সতর্ক করে তা ফেরত দেওয়া হয়।'

    এই স্কুলের এক অভিভাবক অশোক সাহা বলছেন, 'আমার মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। রাত সাড়ে বারোটার সময়েও দেখেছি, সে মোবাইল ফোন দেখছে। আসক্তি তৈরি হচ্ছে। তা বন্ধ করতে অশান্তি হচ্ছে। তবে ছাত্রছাত্রীরা এই বয়সে এত আবেগপ্রবণ হয় যে, কিছু হলে হতাশার শেষ থাকবে না।'

    আবার উল্টো ছবিও রয়েছে। কাঞ্চননগর দীননাথ দাস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুভাষচন্দ্র দত্ত বলছেন, 'মোবাইল ফোন ছাড়া এই প্রজন্ম এগোবে না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দিতেই হবে। তবে একটা গণ্ডি টানা দরকার।'

    কালনা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অশোক মণ্ডল আবার মনে করেন, 'পড়াশোনার জন্য যতটা দরকার, তার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেই হবে। তবে একটা সময়ের পরে রাশ টানা দরকার।' কালনা শহরের জীববিদ্যার শিক্ষক তাপস কাফার বক্তব্য, 'পড়ুয়াদের আবার খেলাধুলোর সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। এখানকার অধিকাংশ স্কুলের পরিকাঠামো এত পুরোনো যে, তা ওদের কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠছে।' যোগ করেন, 'বিদেশে উন্নত মানের টিচিং-লার্নিং মেটেরিয়াল ব্যবহৃত হয়। এখানেও তেমন কিছু চালু হলে ছাত্রছাত্রীরাও মোবাইল ফোন সরিয়ে রাখবে।'

    পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলে রামকৃষ্ণ মিশন হাইস্কুলে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ। স্কুলের প্রধান শিক্ষক স্বামী ভারুপানন্দ মহারাজ বলছেন, 'মোবাইল ফোনে আসক্তি তৈরি হলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে লেখাপড়ায়। আমাদের স্কুলের ভালো ফল হওয়ার সেটা একটা বড় কারণ।' আবার আসানসোলের ওল্ড স্টেশন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক অনুপম ভট্টাচার্য বললেন, 'স্কুলের গেটে গার্ড আছেন। সেখানে একটি রেজিস্টার খাতা আছে। যে সব ছাত্রছাত্রী স্কুল থেকে টিউশন নেয় বা দূর থেকে আসে, তারা মোবাইল ফোন গার্ডের কাছে জমা দিয়ে রেজিস্টার খাতায় সই করে। স্কুল শেষ তারা সেটা ফেরত নেয়। এমনকী শিক্ষকরাও ক্লাসে মোবাইল ফোন নিয়ে যান না। পড়াশোনার জন্য একান্তই প্রয়োজন হলে তাঁরা সেটা ব্যবহার করার অনুমতি নেন।'

    তবে আসানসোলের গড়াই রোডের বাসিন্দা, সরকারি স্কুলের ছাত্র সুবল দাসের যুক্তি, 'বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। বিভিন্ন ক্যুইজে অংশ নিই। সেখানে মোবাইল ফোন খুব কাজ দেয়। অনেক তথ্য মেলে গুগল এবং এআই থেকে।' রানিগঞ্জের এক হাইস্কুলের ছাত্রী শম্পিতা কর্মকারের বক্তব্য, 'আমি সাধারণ পরিবারের মেয়ে। মোবাইল ফোন খুলে পড়াশোনার জন্য নানা তথ্য পাই। তার জন্যই প্রাইভেট টিউশনের দরকার পড়ে না।' বাঁকুড়ার বড়জোড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষক সায়ক গোস্বামী বলছেন, 'মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি উপেক্ষা করা যাবে না। নিঃসন্দেহে মোবাইল ফোন মারফত অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মেলে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পড়ুয়ারা তার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে না। সেটাই সঙ্কট তৈরি করছে।'

    (তথ্য সহায়তা: রূপক মজুমদার, সূর্যকান্ত কুমার, বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, মোহিত দাস)

  • Link to this news (এই সময়)