নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাঙালিরা ‘পাখন্ডি’! দুর্গাপুজোয় তাঁদের খাওয়া-দাওয়া মানেই ‘গন্দে গন্দে ভোজন’! বঙ্গে এসে এই দাবি করে গিয়েছেন বাগেশ্বর বাবা বলে পরিচিত মধ্যপ্রদেশের ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। আর তাতেই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে রাজ্যজুড়ে। সরাসরি পাখন্ডি বা ভণ্ড বলে বাঙালিকে দেগে দেওয়ায় শাক্তমতে বিশ্বাসী বাংলার সনাতনীরা প্রবলভাবে ক্ষুব্ধ। রাজনীতির দরবার পর্যন্ত গড়িয়েছে এই বিতর্ক। সাধারণ মানুষ তো ছিলই, খোদ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য পর্যন্ত মুখ খুলেছেন। তাঁর সাফ কথা, ‘কোন সাধু এসে কী বলে গেলেন, তার জন্য বাঙালি আমিষ খাবে না?’
রবিবার সন্ধ্যায় হাওড়ার লিলুয়ায় আয়োজিত এক ধর্মসভায় দুর্গাপুজো পর্বে বাংলার সমস্ত মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেন এই বাগেশ্বর বাবা। তাঁর মতে নবরাত্রি-দুর্গাপুজোর সময় যাঁরা মাছ-মাংস খায়, তাঁরা ধার্মিক নয়, ভণ্ড! বাগেশ্বর বাবার এই বক্তব্যকে ঘিরে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। শমীকবাবু সাফ বলেছেন, ‘কে কী খাবেন, বাইরে থেকে এসে কেউ ঠিক করে দেবেন না। আমরা বাঙালিরা, নবমীর দিন পাঁঠার মাংস খাই। অষ্টমীর দিন লুচি খাই, এবারও সেটাই খাব! বাঙালি যা খাচ্ছে, তাই খাবে। বাঙালি মাছ খাবে না, মাংস খাবে না, তা আবার হয় নাকি?’ শুধু শমীকবাবুই নন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ডঃ সঞ্জীব সান্যালও উড়িয়ে দিয়েছেন বাগেশ্বর বাবার খাদ্য-বিধানকে। তাঁর বার্তা, ‘শাক্ত হিন্দুত্বের শিকড়ে রয়েছে মাংস। মা দুর্গা ও মা কালীকে মাংস নিবেদন করার প্রাচীন রীতি রয়েছে। ভক্তরা নবমী/দশমীতে সেই মাংস প্রসাদ হিসাবে খান। পবিত্র এই রীতিতে কোনো হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না।’
শাক্ত হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসীদের কাছে মাছ-মাংস পবিত্র ধর্মীয় উপাদান। ‘শক্তিরূপেণ’ দেবীর কাছে পুজোর অন্যতম উপাচার হিসাবে তা নিবেদন করা হয়। সেই মাছ-মাংস প্রসাদ হিসাবে পরম তৃপ্তির সঙ্গে গ্রহণ করেন সবাই। শাক্তমতের এই রীতি যা বৈষ্ণব বা অন্যান্য বহু সনাতন সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ নিরামিষ দর্শনের চেয়ে আলাদা। বাগেশ্বর বাবার বক্তব্য প্রসঙ্গে এদিন স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত উক্তি ‘এদেশে সেই বুড়ো শিব বসে আছেন, মা কালী পাঁঠা খাচ্ছেন আর বংশীধারী বাঁশি বাজাচ্ছেন’ আওড়েছেন শমীক। তাঁর কথায়, ‘স্বামী বিবেকানন্দের উপরে কে আছে? স্বামীজির ওই উক্তি সনাতন সমাজের বহুত্ববাদ ও আবহমান কালের সংস্কৃতির সহাবস্থানকে বোঝায়। মানুষের নিজস্ব আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্বাস এবং তার গভীরে থাকা স্বকীয়তাকে আজও তুলে ধরে স্বামীজির ওই উক্তি।’ মধ্যপ্রদেশ থেকে ধর্মীয় জ্ঞান বিলি করতে আসা বাগেশ্বর বাবা শাক্ত হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী বাঙালি সনাতনীদের সেই আবেগকেই আঘাত করেছেন বলে মনে করছে সবপক্ষ।