একটি বড় বিনিয়োগই বদলে দিতে পারে বাংলার শিল্প-চিত্র: স্বপন দাশগুপ্ত
এই সময় | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এই সময়: নির্বাচনের আগে তাদের ‘সংকল্প পত্রে’ রাজ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আনা এবং শিল্পমহলে রাজ্যের ভাবমূর্তি বদলের কথা জানিয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পরে সেই দিশায় কাজ করতে একাধিক পদক্ষেপের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এমনকী রাজ্যে বড় শিল্প আনতে শিল্পনীতি এবং জমি নীতিতে বদল করা হবে বলেও ঘোষণা করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিল্পে ঘুরে দাঁড়ানোর পথে অন্তত একটি বড় কর্পোরেট সংস্থার আস্থা এবং উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ পশ্চিমবঙ্গের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সেই বিনিয়োগ উৎপাদন শিল্প, ডিপ টেকনোলজি কিংবা অন্য কোনও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। এমন একটি ‘ব্রেকথ্রু’ বা বড় সাফল্যই রাজ্যের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে সোমবার জানিয়েছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।
এ দিন নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে রাজ্যের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো— পশ্চিমবঙ্গ ব্যবসা এবং বিনিয়োগের জন্য ফের প্রস্তুত সেই বার্তা শিল্পমহলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী যদি রাজ্যের উপরে আস্থা দেখিয়ে বিনিয়োগ করে, তা হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আরও বহু বিনিয়োগকারীকে রাজ্যের দিকে তাকাতে উৎসাহিত করবে।’ এই সাফল্য অর্জনের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব রকম উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের শিল্প-অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিকে অতীতের সঙ্গে তুলনা করে স্বপন বলেন, ‘রাজের সামনে আসলে নতুন করে শিল্পায়নের পথ তৈরি করার পাশাপাশি পুরোনো গৌরব ফিরে পাওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের অনেক রাজ্যের কাছে দ্রুত শিল্পোন্নয়ন তুলনামূলক ভাবে নতুন অভিজ্ঞতা হলেও পশ্চিমবঙ্গ একসময় শিল্পের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। পরবর্তী সময়ে সেই অবস্থান হারিয়েছে রাজ্য। ফলে এখন লক্ষ্য শুধু এগিয়ে যাওয়া নয়, বরং যা হারিয়েছে তা পুনরুদ্ধার করা।’ তাঁর মতে, এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি অন্য রাজ্যের তুলনায় আলাদা।
রাজ্যের বিপুল সরকারি ঋণ নিয়েও উদ্বেগের কারণ দেখছেন না অর্থমন্ত্রী। তাঁর হিসেব অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ঋণের পরিমাণ ৮ লক্ষ কোটি টাকা। তবে এই ঋণ বিনিয়োগের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি মনে করেন না। উদাহরণ হিসেবে মহারাষ্ট্রের কথা তুলে ধরে স্বপন জানান, ওই রাজ্যের সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯ লক্ষ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি ঋণের অঙ্ক কত, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অর্থনীতি আগামী দিনে কী ভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটাই বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মহারাষ্ট্র ইতিমধ্যেই একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, পশ্চিমবঙ্গকে এখন সেই বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে হবে।’
কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধে রাজ্যে আনার ক্ষেত্রেও সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান। তাঁর অনুমান, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী আট মাসে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার কেন্দ্রীয় সম্পদ পশ্চিমবঙ্গে আসতে পারে। তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ টানার জন্য ব্যবসার পরিবেশে যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা দীর্ঘস্থায়ী—এই বিশ্বাস শিল্পমহলের মধ্যে তৈরি করাই আসল কাজ বলে মনে করেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘বছরের পর বছর ধরে রাজ্যে এমন একটি প্রশাসনিক মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যেখানে ব্যবসাবান্ধব হওয়ার ধারণাই তৈরি হয়েছিল না। সেই সংস্কৃতি বদলাতে সরকারকে অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় আরও এক ধাপ বেশি এগোতে হবে।’ শুধু নীতির ঘোষণা নয়, শিল্পপতিদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সহজ করা এবং প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি বলে তাঁর দাবি।