সুদেষ্ণা ঘোষাল, নয়াদিল্লি
এক দিকে আতঙ্ক— ‘আমাদের বাড়িটাও ভেঙে পড়বে না তো?’
অন্য দিকে উদ্বেগ— ‘এই বাড়িটা ছেড়ে এখনই নতুন মেস বা পিজি পাব কোথায়?’
এমনই ছবি দিল্লির ‘পশ’ এলাকা মোতিবাগের সত্য নিকেতন এলাকায়৷ এখানে শুধুই ধ্বংস, হাহাকার আর উদ্বেগের ছবি৷ রবিবার একটা ছ’তলা বাড়ি ভেঙে সাত জন তরতাজা পড়ুয়ার মৃত্যুর পরে গোটা এলাকাটাই কেমন যেন থমথমে। ‘হস্টেল ডেজ়’ নামে যে বিল্ডিংটি ভেঙেছে তার আশেপাশের বেশ কয়েকটি বাড়িকে ইতিমধ্যেই ‘বিপজ্জনক’ তকমা দিয়েছে দিল্লি পুরনিগম (এমসিডি)৷ আজ, বুধবার থেকে শুরু হবে এই বিপজ্জনক বাড়িগুলি ভাঙার কাজ৷ এ দিকে, আতঙ্ক চেপে বসেছে সত্য নিকেতন এলাকার মেস–পিজিতে থাকা পড়ুয়াদের মনে। পেয়িং গেস্ট (পিজি) অ্যাকোমডেশন হিসেবে চলা পুরোনো বহুতলগুলোতে আর থাকতেই ভরসা পাচ্ছেন না পড়ুয়ারা, উল্টে নিচু অর্থাৎ এক–দু’তলা পিজি বা মেসের চাহিদা বাড়ছে। রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে সেগুলোর ভাড়া!
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে বাইরের রাজ্য থেকে পড়তে আসা পড়ুয়ারাই মূলত সত্য নিকেতন এলাকায় থাকেন। কলেজ হস্টেলে যাঁরা জায়গা পান না, তাঁদের সুবাদেই সত্য নিকেতনে ফুলেফেঁপে উঠেছে মেস–পিজির ব্যবসা। সেখানেই দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া গার্গী চতুর্বেদী বলেন, ‘মনে আতঙ্ক চেপে বসেছে৷ যে ভাবে রবিবার ‘হস্টেল ডেজ়’ মেসবাড়িটা ভেঙে পড়ল হুড়মুড় করে, সেটা দেখার পরে এই এলাকার কোনও বহুতল মেস বা পিজিকেই আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না৷ আমরা যেখানে থাকি, সেই কনকলতা বাড়িটাও ভেঙে দেওয়া হবে বলে পুরসভা জানিয়ে দিয়েছে৷ এখানে এতদিন ধরে থাকা আমাদের মতো পড়ুয়ারা বুঝতেই পারছেন না কোন বাড়িটা নিরাপদ, আর কোনটা নয়!’
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ছোট মেসগুলোর ভাড়া আকাশছোঁয়া। দিল্লিতে নিট–এর প্রস্তুতি নিতে আসা ভোপালের ছাত্রী নিশা শর্মার দাবি, ‘গত দু’দিন ধরে শুধু পিজি খঁুজছি৷ আগে যেখানে মাসে ১০-১১ হাজার টাকায় এসি বেড এবং দু’বেলার খাবার পেতাম, এখন সেখানে শুধু এসি বেডের ভাড়াই চাইছে ১৮-১৯ হাজার টাকা! ব্রেকফাস্ট আর ডিনারের খরচ আলাদা৷ এত টাকা কোথায় পাব? বাড়ির লোকজনও চিন্তায় পড়ে গিয়েছেন৷’
ঘটনার দিন ‘হস্টেল ডেজ়’ যখন ভেঙে পড়ছে, পাশের পিজি বিল্ডিংয়ের দেওয়াল, সিলিংয়েও দেখা দিয়েছিল ফাটল। বরাতজোরে পালিয়ে বেঁচেছেন সেখানকার দুই আবাসিক অর্নিকা এবং মানসী। ঘরে ফাটল ধরার ভিডিয়োও করেছেন তাঁরা। বছর কুড়ির দুই ছাত্রীর বক্তব্য, ‘মনে হচ্ছিল, আমাদের বিল্ডিংটাই বোধহয় ভেঙে পড়বে। দৌড়ে পালাতে গিয়ে দেখলাম পাশের পিজি বিল্ডিংটা ধূলিসাৎ, আর সেই ধ্বংসস্তূপে আমাদের বিল্ডিংয়ের গেটটা ঢাকা পড়ে গিয়েছে। কোনওক্রমে সে দিন প্রাণে বেঁচেছি।’ আতঙ্ক এখনও কাটেনি মানসীর। বললেন, ‘কোনও দিন ভুলব না ওই ভয়ানক দৃশ্য৷ চোখের সামনে বিশাল বাড়িটা ভেঙে পড়ছে আর লোকে আর্তনাদ করছে। এই ঘটনা দেখার পরে দু’দিন ঘুমোতে পারিনি৷ তার মধ্যে এখন নতুন পিজি খঁুজতে হচ্ছে৷ সেটাও কতটা নিরাপদ হবে, কে জানে!’
তবে এর মধ্যে সাহায্যের হাতও পাচ্ছেন অনেক পড়ুয়া। সত্য নিকেতন এলাকায় থাকা যে সব পড়ুয়া আপাতত ঠাঁইহারা হয়ে গিয়েছেন, তাঁদের জন্য ক্যাম্পাস খুলে দিয়েছে একাধিক কলেজ। আত্মারাম সনাতন ধর্ম কলেজ (এআরএসডি), জেসাস অ্যান্ড মেরি কলেজ এবং শহিদ ভগৎ সিং কলেজ ঘরহারা পড়ুয়াদের ক্যাম্পাসে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এআরএসডি কলেজ ক্যান্টিনে ঘরহারা পড়ুয়াদের জন্য রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেশ কিছু কলেজ নিজেদের ক্লাসরুম, ইউনিয়ন রুম খুলে দিয়েছে পড়ুয়াদের থাকার জন্য।
এ দিকে, দিল্লি ইউনিভার্সিটি তাদের অধীনস্থ সব ক’টি কলেজের থেকে পড়ুয়াদের তালিকা চেয়েছে, যাঁরা সত্য নিকেতন এলাকার মেস বা পিজি অ্যাকোমডেশনে থাকেন। রবিবার বাড়ি ভেঙে যে যে পড়ুয়া মারা গিয়েছেন , তাঁদের পরিবারকে ভাইস–চ্যান্সেলর’স ফান্ড থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে দিল্লি ইউনিভার্সিটি। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কি ফেরাতে পারবে এতগুলো তরতাজা প্রাণ? নিশ্চিত করতে পারবে বাকিদের সুরক্ষা? প্রশ্ন অনেক, উত্তর অজানাই।