কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
শিব্রাম চক্কোত্তি বেঁচে থাকলে হয়তো এই ঘটনাকে ‘হাত নিয়ে হাতাহাতি’ বলে উল্লেখ করতেন। সম্প্রতি বিভিন্ন খবরের কাগজে একটি সরকারি বিজ্ঞাপনে মা দুর্গার ১১ হাতের ছবি দেওয়া নিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছে রাজ্য সরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ভয়াবহ ট্রোল–যুদ্ধ শুরু হয়েছে, দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর নিধনের সময়ের তীব্রতাও হয়তো তার চেয়ে কম ছিল। তবে তারই মধ্যে আগ্রহীদের প্রশ্ন, দুর্গার হাত ‘আসলে’ ক’টি? ২ থেকে শুরু করে ৩২ পর্যন্ত বিভিন্ন সংখ্যক হাতের দুর্গার এ পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। যদিও হাতের সংখ্যা সব সময়েই জোড়সংখ্যক। ৩, ৫,৭ ও ১১ হাতের দুর্গার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
প্রচলিত এবং সহজ ব্যাখ্যা অনুযায়ী—দেবতারা অসুরনিধনের আগে দেবীকে একটি করে অস্ত্র দিয়েছিলেন। ১০ দেবতা, ১০ অস্ত্র—সেই জন্যই ১০ হাত। কিন্তু চতুর্থ শতাব্দীতে লেখা দুর্গাপুজোর বর্ণনা পাওয়া ‘দেবীমাহাত্ম্য’ তেমনটা বলে না। মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১ থেকে ৯৩তম অধ্যায়ের অন্তর্গত ৭০০ শ্লোকের দেবীমাহাত্ম্যই ‘দুর্গাসপ্তশতী’ বা ‘চণ্ডীপাঠ’ নামে পরিচিত। এই গ্রন্থে দেবীর ৮, ১০ এবং ১৮—তিন রকম হাতের উল্লেখ রয়েছে। যুদ্ধের সময়ে আবার তিনি সহস্র বাহুতে চার দিক পূর্ণ করে দাঁড়িয়েছেন, এমন বর্ণনাও আছে। মহিষাসুর-বধের মূল কাহিনি এখানেই।
পুরাণ অনুযায়ী মহিষাসুর ইন্দ্রের সিংহাসন দখল করার পরে শিব, বিষ্ণু এবং অন্য দেবতাদের তেজ মিলিত হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করে। পরে দেবতারা তাঁকে নিজেদের অস্ত্র ও শক্তি দেন। শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর সুদর্শনচক্র, বরুণের শঙ্খ ও পাশ, অগ্নির বর্শা, বায়ুর ধনুক ও দুই তূণীর, ইন্দ্রের বজ্র ও ঐরাবতের ঘণ্টা, যমের দণ্ড, ব্রহ্মার অক্ষমালা ও কমণ্ডলু, সূর্যের রশ্মি, কালের তরবারি ও ঢাল, বিশ্বকর্মার কুঠার ও বর্ম, কুবেরের অশেষ পানপাত্র, শেষনাগের সর্পমালা এবং হিমালয়ের অলঙ্কার ও সিংহ—সব মিলিয়ে দাতা দেবতা প্রায় ১৫ জন, আর বস্তু ২০–রও বেশি। ফলে ‘এক দেবতা, এক অস্ত্র, এক হাত’-এর অঙ্ক টেকে না।
আজকের জনপ্রিয় দশভুজা রূপের বর্ণনা পাওয়া যায় প্রতাপচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘দুর্গা পূজা’ গ্রন্থে। এই বইটি ১৮৭১–য় কলকাতায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে দশভুজা প্রতিমার বিশদ বিবরণে রয়েছে, ডান হাতে ত্রিশূল, তরবারি, চক্র, শর ও বর্শা; বাঁ হাতে ঢাল, ধনুক, পাশ, অঙ্কুশ ও ঘণ্টা—কিছু ক্ষেত্রে ঘণ্টার বদলে কুঠার। ডান–পা সিংহের উপরে, বাঁ–পা মহিষাসুরের উপরে। মোষের মস্তকহীন ধড় থেকে অসুর বেরিয়ে আসে, হাতে তরবারি। প্রতাপচন্দ্র ঘোষ দুর্গাপুজোর আচারগ্রন্থ হিসেবে কালিকাপুরাণ, দেবীপুরাণ ও বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণের কথাও বলেছেন—শুধু মার্কণ্ডেয় পুরাণের নয়।
পুরাণবিশারদরা জানাচ্ছেন, দুর্গাসপ্তশতীর তিন ‘চরিতের’ মধ্যে প্রথম চরিতের ‘মহাকালী’ দশমুখী, দশপদী ও দশভুজা। মধ্যম চরিতের ‘মহালক্ষ্মী’ আঠারোভুজা। এখানেই মহিষাসুর-বধের কাহিনি রয়েছে। তৃতীয় চরিতের ‘মহাসরস্বতী’ অষ্টভুজা, যাঁর সঙ্গে শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ হয়। ফলে মহিষাসুর-বধের ধ্যানরূপটি দশভুজা নয়, আঠারোভুজার। তবে এই আঠারোকেও কাহিনির স্বতঃসিদ্ধ বর্ণনা বলে মনে করা হয় না। এ ছাড়া অন্য কয়েকটি প্রচলিত ধারণা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এই কাহিনিতে মহিষাসুরকে ত্রিশূলে বধ করার কথা নেই। দেবী বর্শায় আঘাত করে, পরে তরবারিতে তার মস্তক ছিন্ন করেন। আবার মহাভারত অনুযায়ী মহিষাসুরকে বধ করেন স্কন্দ বা কার্তিকেয়। এই ভিন্নতার মধ্যেই শাস্ত্র ও লোকাচারের সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়। শাস্ত্রে নেই এমন অনেক কিছুই পরে লোকাচারে যুক্ত হয়েছে।
তা হলে এত সংখ্যক হাতের অর্থ কী? এই প্রসঙ্গে পুরাণ বিশারদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী বলেন, ‘হাতের এই কাহিনি আসলে রূপক। যত বেশি হাত, তত বেশি অস্ত্র অর্থাৎ তত বেশি শক্তি। দেবতারা একা মহিষাসুরকে হারাতে পারেননি। তাঁদের শক্তি এক দেহে, এক ইচ্ছায় মিলিত হয়েছিল। বহু হাত সেই সম্মিলিত শক্তির দৃশ্যমান রূপ। ২, ৮, ১০, ১৮ কিংবা সহস্র—সংখ্যা বদলেছে, মূল ভাবটি নয়। এটি হলো সীমাহীন শক্তিকে মূর্তির সীমার মধ্যে প্রকাশ করা।’ পুরাণবিশারদ বলেন, ‘রামকৃষ্ণ পরমহংস দুর্গার রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন ‘১৮ হাত থেকে শুরু করে ২ হাত পর্যন্ত দেখেছি। তারপর কিছুই দেখিনি।’ এটাই আসল সাধকের অন্তর্দৃষ্টি।’
এই বক্তব্যকেই জোরালো সমর্থন করেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ শুভ মজুমদার। তিনি বলেন, ‘দেবী প্রথমে কিন্তু মহিষমর্দিনী ছিলেন। পরে ক্রমশ দুর্গারূপটি আসে। এখনও পর্যন্ত প্রাচীনতম যে মহিষাসুরমর্দিনীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, সেটি রাজস্থানের নাগর থেকে। সেখানে দেবীর ৪টি হাত। আবার উত্তর দিনাজপুরের বেতনা থেকে ৩২ হাতযুক্ত দুর্গাও পাওয়া গিয়েছে। এ ছাড়া ১৮ হাত, ১৬ হাত, ১২ হাতের দুর্গার বহু নিদর্শন রয়েছে।’ বাঙালি শিল্পীরা ১০ হাতের দুর্গাকেই ‘স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে ধরে নিয়েছেন।
মূর্তিশাস্ত্রবিদদের অনেকেই মনে করেন, দুর্গার বর্তমান মূর্তি লক্ষণ সেনের সময় থেকে প্রচলিত। বাঙালি শিল্পীর কল্পনায় পুত্র–কন্যাদের সঙ্গে নিয়ে দেবীর চার দিনের জন্য বাপের বাড়ি আসা যে মানবীয় ভাবের মাধুর্য এনে দিয়েছে, সেটা মহিষাসুরমর্দিনীর অন্য কোনও মূর্তিতে সম্ভব নয়। পুরাণ দেবীকে কঠোর এবং রণচণ্ডী হিসেবে দেখিয়েছে। ইতিহাস তাঁর পাষাণমূর্তি রক্ষা করেছে। কিন্তু বাংলার মাটি দুর্গাপ্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলা মূর্তির পুজো করে না—ভাবের পুজো করে। বাংলা দুর্গার মূর্তিতে বিশ্বাস করে না। বাংলা মনে করে গোটা বিশ্বই দুর্গার অবয়ব। তাই বাংলা প্রতিমা গড়ে উৎসব পালন করে।