• ভুয়ো আইডি কার্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ইভেন্টের আগেই সশস্ত্র যুবকদের প্রবেশের চেষ্টা? আসল ঘটনা জানাল মুম্বই পুলিশ
    এই সময় | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ইভেন্ট ছিল মঙ্গলবার সন্ধেয় বান্দ্রা–কুরলা কমপ্লেক্সে (বিকেসি)। ঠিক তার আগের রাতে ওই বিকেসি কমপ্লেক্সেই একটি শপিং মল থেকে পুলিশের নজরদারিতে ধরা পড়লেন দু'জন। তাঁদের মধ্যে এক জনের কাছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা পিএমও–র ভুয়ো আই–কার্ড এবং অন্য জনের কাছে উদ্ধার হয় আগ্নেয়াস্ত্র। গ্রেপ্তার করা হয় দু'জনকেই। মোদীর ইভেন্টের আগে কেন পিএমও আধিকারিক পরিচয় দিয়ে কেউ ঢুকবেন? শুরু হয় জল্পনা। নাশকতার আশঙ্কাও জোরালো হয়। পুলিশ অবশ্য পরে দাবি করে, প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানের সঙ্গে এই গ্রেপ্তারির কোনও যোগসূত্র নেই। কিন্তু তাতে বিতর্কে ইতি পড়ছে না। বিশেষ করে ভুয়ো আই–কার্ড নিয়ে ধৃত যুবকের আইনজীবী মঙ্গলবার যখন দাবি করেন, তাঁর মক্কেল গত দু'বছর ধরে নিজেকে পিএমও আধিকারিক ভেবেই কাজ করে চলেছেন এবং তাঁর মক্কেল নিজেই নাকি প্রতারণার শিকার!

    মঙ্গলবার সন্ধে পৌনে ছ'টা নাগাদ বিকেসি–র 'নীতা মুকেশ আম্বানি কালচারাল সেন্টার'–এ 'গ্লোবাল ফিনটেক ফেস্ট'–এর উদ্বোধন করেন মোদী। এই ইভেন্ট শুরুর ঘণ্টা দু'য়েক আগে পুলিশেরই এক আধিকারিক জানান, ভুয়ো পিএমও আধিকারিক পরিচয় দিয়ে কালচারাল সেন্টারে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন বছর চব্বিশের রোহন পারেখ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সশস্ত্র এক নিরাপত্তারক্ষী। পিএমও–র কার্ডটা নকল বুঝতে পেরেই অভিযুক্তদের আটক করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

    কিন্তু এর আধ ঘণ্টার মধ্যেই কাহানি মে নয়া টুইস্ট! মুম্বই পুলিশই বিবৃতি জারি করে বলে, 'ঘটনাটি সোমবার রাতের। মোদীর ইভেন্ট–স্থলে ঢোকার কোনও চেষ্টা হয়নি।সোমবার রাতে জনা তিনেক লোক সন্দেহজনক সরকারি আইডি কার্ড এবং একটি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বান্দ্রা–কুরলা কমপ্লেক্সেরই 'জিও ওয়ার্ল্ড প্লাজ়া' শপিং মলে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি এক জনের খোঁজে চলছে তল্লাশি। অভিযুক্তের কাছে পাওয়া আগ্নেয়াস্ত্রটির লাইসেন্স রয়েছে। তবে তাঁরা কেন ভুয়ো পরিচয়পত্র নিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলেন, তা খতিয়ে দেখছে ক্রাইম ব্রাঞ্চ। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ইভেন্টের কোনও যোগসূত্র নেই।' কিন্তু মোদীর অনুষ্ঠানের ঠিক আগে এই ঘটনা এবং ধৃত রোহনের পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হওয়াতেই জল্পনা বাড়ছে।

    এ দিন রোহনকে আদালতে তোলা হলে তাঁকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের দাবি, সোমবার রাতে রোহন যখন শপিং মলে ঢুকছেন, তখন পাশের কালচারাল সেন্টারে প্রধানমন্ত্রীর ইভেন্টের প্রস্তুতি চলছিল। রোহনের কাছে আপত্তিকর কিছু না পাওয়ায় তাঁকে শপিং মলে ঢুকতে বাধা দেননি নিরাপত্তারক্ষী। কিন্তু পরে রোহনের বডিগার্ড, মধ্য চল্লিশের দিলীপ কুন্ডে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মলে ঢোকার চেষ্টা করলে 'ডোর ফ্রেম মেটাল ডিটেক্টর' চেকিংয়ে আটকে যান। দিলীপ ফোন করেন রোহনকে। বছর চব্বিশের রোহন তখন মলের এন্ট্রান্সে এসে নিরাপত্তারক্ষীকে নিজের আইডি কার্ড দেখান। তাতে দেখা যায়, রোহন পিএমও–র গ্রেড–সি অফিসার! কিন্তু কার্ডটা দেখে সন্দেহ হয় নিরাপত্তরক্ষীর। কারণ, কার্ডে ইস্যুর ডেট থাকলেও কতদিন বৈধ, তা উল্লেখ করা নেই, যা অন্যান্য সরকারি আইডি কার্ডে থাকে। যিনি ইস্যু করেছেন, কার্ডে তাঁর স্বাক্ষর থাকলেও পদাধিকারও উল্লেখ করা ছিল না। নিরাপত্তারক্ষীই খবর দেন পুলিশে। এর পরেই ভুয়ো পরিচয় দিয়ে, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সুরক্ষিত এলাকায় ঢোকার অভিযোগে দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চ পুরো ঘটনার তদন্ত করছে। কিন্তু সন্দেহভাজন তৃতীয় ব্যক্তি কে, তা মুম্বই পুলিশের বিবৃতিতে স্পষ্ট নয়।

    এ দিকে, রোহনের আইনজীবী মঙ্গলবার কোর্টে দাবি করেন, ২০২৪–এ তাঁর মক্কেল যখন বিভিন্ন জায়গায় চাকরির অ্যাপ্লিকেশন করছেন, তখন অঙ্কে স্নাতক রোহনকে ই–মেল পাঠান তরুণ কাপুর নামে এক জন। রোহনকে জানানো হয়, পিএমও–র উপদেষ্টা হিসেবে তিনি চাকরি পেয়েছেন। মহেক গুপ্তা এবং তরুণ গুপ্তা নামে দু'জনের সঙ্গে কাজের সূত্রে তাঁকে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়। রোহনের আইনজীবীর দাবি— অফার লেটার, আইডেন্টিটি কার্ড, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম ও স্বাক্ষর সম্বলিত একটি চিঠিও তাঁর মক্কেলকে ই–মেলে পাঠানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর অ্যাডিশনাল সেক্রেটারির থেকেও নাকি একটি ই–মেল পেয়েছিলেন তিনি।

    আইনজীবীর দাবি, এগুলো দেখে রোহনের মনে হয়েছিল, তিনি সত্যিই পিএমও–র কর্মী হিসেবে চাকরিটা পেয়েছেন। সব কথাবার্তা চলতে থাকে ফোন এবং ই–মেলে। ২০২৪–এর ডিসেম্বরে নিয়োগকারীদের কথাতেই নাকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ করেন রোহন। তার পর থেকে অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী দিলীপ তাঁর বডিগার্ড হিসেবে কর্মরত। রোহনের আইনজীবীর দাবি, ই–মেলে পাওয়া সব 'সরকারি' নথিপত্র কোর্টে জমা দিয়েছেন তাঁরা। পিএমও আধিকারিক পরিচয় দিয়ে যাঁরা ফোন করতেন, তাঁদের কন্ট্যাক্ট ডিটেলসও শেয়ার করেছেন পুলিশের সঙ্গে। কিন্তু দু'বছর ধরে রোহন কার থেকে বেতন পেলেন? অফিসে না গিয়ে রোহন পিএমও–র হয়ে কী কাজই বা করলেন— কোনওটাই স্পষ্ট নয়।

    আইনজীবীর দাবি, সোমবার রাতে বাগদত্তার জন্য পারফিউম কিনতে ওই শপিং মলে গিয়েছিলেন রোহন। পরদিন সেখানে যে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান, সেটা তাঁর জানা ছিল না! কিন্তু এত দিন ধরে রোহনের ভুয়ো আইডি কার্ড কেন ধরা পড়ল না, সেই প্রশ্নও উঠছে। পুলিশের একাংশের আবার দাবি, মহারাষ্ট্রের খারে ড্রোনের ব্যবসা করেন রোহন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রবেশাধিকার পেতে নিজেই নাকি ভুয়ো আইডি কার্ড বানিয়ে সকলকে ধোঁকা দিচ্ছিলেন তিনি! কিন্তু শপিং মলে সেটার কী প্রয়োজন ছিল? সেটাও বান্দ্রা–কুরলা কমপ্লেক্সের মতো হাই–সিকিউরিটি জ়োনে! ধোঁয়াশা অনেক, জবাব আপাতত অধরাই।

  • Link to this news (এই সময়)