কাছের মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরেই সবার আগে মাথায় আসে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার চিন্তা। আর হাসপাতাল যদি বেসরকারি হয়, তাহলে মাথায় চেপে বসে বিপুল অঙ্কের বিলের চিন্তা। এখন বহু নাগরিক স্বাস্থ্য বিমা করে থাকেন, তারপরেও খরচ নিয়ে চিন্তা স্বাভাবিক। কারণ বিমা সব সময়ে সব ধরনের খরচ কভার করে না বলেই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, বিমা সংক্রান্ত আলোচনারও আগে জরুরি হাসপাতালের বিল ঠিকমতো পড়তে শেখা।
নানা হাসপাতাল নানা ভাবে তাঁদের পরিষেবার খরচের খাত বিলে দেখায়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশ কিছু খাত বেশ পরিচিত। দিন প্রতি বেড চার্জ (Bed Charge), কোনও অস্ত্রোপচার হলে তার খরচ কত নেওয়া হয়েছে, ওটি চার্জ, ডাক্তারের ফি, কনজ়িউমেবল (Consumable Items), ওষুধের খরচ... এমন নানা খাতে খরচ ধরে মোট বিল তৈরি হয়।
Room Rent বা Bed Charge:
বেড চার্জ কী ভাবে নেওয়া হয়েছে, ভর্তি ও রোগীকে ছুটি দেওয়ার মধ্যে সময় গুনে দেখে নেওয়া উচিত কত টাকা নেওয়া হয়েছে। অনেক বিমায় বেড চার্জের ক্যাপিং থাকে। তার চেয়ে বেশি দামের ঘর বা শয্যা নিলে অতিরিক্ত টাকা পকেট থেকে দিতে হয়। বেশি দামের ঘরে আপগ্রেড করা হলে, আনুষঙ্গিক খরচও অনুপাতে বেড়ে যেতে পারে। Room rent-এর পাশাপাশি আলাদা করে নার্সিং বা bedside procedure-এর চার্জ নেওয়া হলে তা যাচাই করতে পারেন।
ওষুধ:
রোগী যখন ভর্তি ছিলেন, তখন তাঁকে কী কী ওষুধ দেওয়া হয়েছে, সেই তালিকা একবার খতিয়ে দেখে নিন। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হলেও করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন। মনে কোনও প্রশ্ন থাকলে এবং সম্ভব হলে রোগীকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।
কনজ়িউমেবল:
সিরিঞ্জ, গ্লোভস, মাস্ক, স্যানিটাইজ়ার, তুলোর মতো একাধিক জিনিস রয়েছে যা কনজ়িউমেবলসের তালিকায় পড়ে। অনেক বিমা-ই এই জিনিসের দাম কভার করে না। যেহেতু পকেট থেকে যাচ্ছে, সেই কারণে তালিকা দেখে নিন। কোনও কারণে সন্দেহ হলে সরাসরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।
ডাক্তারের ফি:
কোন চিকিৎসক কবে রোগীকে দেখেছেন, তাঁর নাম এবং ফি ঠিক ভাবে বিলে উল্লেখ রয়েছে কি না, দেখুন। চিকিৎসকের নাম ছাড়া কোনও ফি বিলে দেখালে হাসপাতালের কাছে ব্যাখা চাইতে হবে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ:
CT scan, MRI বা অন্যান্য diagnostic test করা হলে তার দাম দেখে নিন। পরীক্ষার রিপোর্ট ঠিকমতো দেওয়া হয়েছে কি না, দেখতে হবে। বিমার কভার নিলে অরিজিনাল নথি সেখানেই যাবে। প্রয়োজনে তার কপি হাসপাতালের থেকে চেয়ে নিতে পারেন।
সবার আগে জানা প্রয়োজন নিজের স্বাস্থ্য বিমাটি কী কী কভার করছে। IRDA লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইন্স্যুরেন্স অ্যাডভাইজ়ার ছোটন আইচ বলছেন, ‘প্রোপোজ়াল ফর্ম ভালো করে ফিল আপ করতে হবে। যদি কোনও রোগ থাকে, মেডিক্যাল হিস্ট্রি থাকে, সেটা স্পষ্ট করে লিখতে হবে।’ তিনি জানাচ্ছেন, ক্লেম রিজ়েকশন হয় যদি Misrepresentation of Fact হয়। এই কারণেই আগে থেকে সব স্পষ্ট করে লেখা উচিত। তিনি আরও জানাচ্ছেন, কোনও কোনও বিমার কভারে নির্দিষ্ট অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অঙ্কের প্যাকেজ থাকে। নেটওয়ার্কের হাসপাতালে গেলে, সেই প্যাকেজ দেখে নিয়ে ভর্তি হওয়া যেতে পারে। প্ল্যানড কোনও সার্জারি থাকলে, আগে থেকে খোঁজ খবর নিয়ে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।
পার্সোনাল ফিনানশিয়াল অ্যাডভাইজ়ার সোমনাথ পালেরও মত, ‘প্রোপোজ়াল ফর্ম ঠিকমতো ফিল আপ করতেই হবে এবং যিনি বিমা করছেন, তাঁকেও পড়তে হবে।’ তিনি জানাচ্ছেন, এই জন্যই বিমা করানোর আগে নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজন কী কী, তা আগে থেকে আলোচনা করে স্থির করতে হয়। তেমন হলে এখন একাধিক রাইডার ব্যবহার করে টেলর-মেড পলিসি তৈরি করার সুযোগ রয়েছে।
প্রথমেই হাসপাতালের কাছে Itemised Bill চাইবেন। সমস্যা মিটছে না, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে হাসপাতালের Internal Grievance Redressal Officer-এর কাছে অভিযোগ করা যায়। বিমা সংস্থার এজেন্টের সঙ্গে কথা বলবেন। Consumer Disputes Redressal Commission-এর কাছেও যাওয়া যায়। তবে রোগীকে বাড়ি আনার আগে আপনাকে বিল মেটাতেই হবে। পরে অতিরিক্ত বিল চার্জের অভিযোগ তুলে অবশ্যই আইনি পথে হাঁটা যায়।