আজকাল ওয়েবডেস্ক: চিকিৎসা কিংবা পর্যটনের টানে প্রতিদিন বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ পা রাখেন তিলোত্তমায়। আর সেই সুযোগকেই হাতিয়ার করে শহরে জাল বিস্তার করেছে সীমান্তপারের মোবাইল চুরি ও ছিনতাইয়ের সংঘবদ্ধ চক্র। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্যে উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর চিত্র। লালবাজার সূত্রের খবর, গত পাঁচ বছরে মহানগরে মোবাইল চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৯ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের হেফাজত থেকে উদ্ধার হয়েছে মোট ২৮১টি মোবাইল ফোন।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের কাছ থেকে মেলা ফোনের সিংহভাগই অ্যান্ড্রয়েড; এর মধ্যে রয়েছে মাত্র ১০ থেকে ১২টি আইফোন। ধৃত ৯ জনের পরিচয়পত্র যাচাই করে গোয়েন্দারা জেনেছেন, অভিযুক্তদের মধ্যে ৪ জন চট্টগ্রামের, ৩ জন সিলেটের এবং ২ জন ঢাকার বাসিন্দা। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এদের অধিকাংশই কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নন, পর্যটন কিংবা চিকিৎসার মতো বৈধ ভিসা নিয়েই ভারতে এসেছিলেন। শহরে পা রাখার পর স্থানীয় অপরাধীদের সঙ্গে আঁতাত গড়ে তুলে জনবহুল এলাকাগুলিতে ‘অপারেশন’ চালাত এই চক্র।
উদ্ধার হওয়া ফোনের সংখ্যা গোয়েন্দাদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কারও কাছ থেকে একলপ্তে ১৩১টি, কারও থেকে ৫৬টি বা ৫৩টি করে মোবাইল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ৩১, ২২, ১৭ ও ২টি করে হ্যান্ডসেটও মিলেছে অভিযুক্তদের থেকে। অর্থাৎ, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, রীতিমতো বড়সড় সিন্ডিকেট কাজ করছে।
উদ্ধার হওয়া ফোনের বড় অংশই অ্যান্ড্রয়েড হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে এক পুলিশকর্তা জানান, অ্যান্ড্রয়েড হ্যান্ডসেটকে নিশানা করা তুলনায় সহজ। প্রযুক্তিগত সুরক্ষার কারণে আইফোন একবার লক হয়ে গেলে মালিকের অনুমতি ছাড়া তা আনলক করা প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের লক ভাঙা এবং সফটওয়্যার কারচুপি করে দ্রুত হাতবদল করা অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ অন্য জায়গায়। লালবাজারের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, চুরি যাওয়া এই ফোনগুলি কেবল স্থানীয় চোরাই বাজারে বিক্রি হয় না; অনেক ক্ষেত্রে চড়া দামে তা দেশবিরোধী কিংবা নাশকতামূলক কার্যকলাপে যুক্ত সংগঠনের হাতেও পৌঁছে দেওয়া হয়, যা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি পার্ক সার্কাস স্টেশন এলাকা থেকে এক কলেজ ছাত্রীর মোবাইল চুরি যাওয়ার পর জানা যায়, সেটি বাংলাদেশে নিয়ে গিয়ে ‘সুইচ অন’ করা হয়েছে। যদিও ভারতের সীমানার বাইরে ফোন সক্রিয় হলে তা শনাক্ত করার প্রযুক্তি কলকাতা পুলিশের হাতে নেই। ফলে এই তথ্য কীভাবে প্রকাশ্যে এল এবং শহর থেকে আর কত হাজার ফোন এভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে পাচার হয়ে গিয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, পাঁচ বছরে ৯ জন গ্রেপ্তার এবং ২৮১টি ফোন উদ্ধার হলেও শহরে চুরি যাওয়া মোট ফোনের সংখ্যা এর বহুগুণ বেশি। উদ্ধার হওয়া ফোনের চেয়ে নিখোঁজ ফোনের সংখ্যাই বিশাল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক এই চক্রের শিকড় কতটা গভীরে? কলকাতা থেকে চুরি যাওয়া ফোনগুলি সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে চলে যাওয়ার পর সেখান থেকে দেশের সংবেদনশীল তথ্য বাইরে পাচার হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই আন্তর্জাতিক চোরাচালান রুখতে এবং বাকি ফোনগুলির গন্তব্য খুঁজে বের করতে আপাতত কড়া তদন্ত চালাচ্ছে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ।