গোপাল সাহা: রাজ্যে পালাবদল পরেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি বজায় রয়েছে। প্রকাশ্যে আসছে একের পর এক দুর্নীতির খবর। এবার কলকাতা শহর তথা রাজ্যজুড়ে সিসিটিভির অচলাবস্থা ও তার দুর্নীতির একাধিক তথ্য সামনে আসতেই বিপাকে পুলিশ প্রশাসন। বলাবাহুল্য, অপরাধ দমনে পুলিশের অন্যতম বড় হাতিয়ার সিসি ক্যামেরা। কোনও অপরাধ ঘটলে অভিযুক্তকে শনাক্ত করা থেকে শুরু করে যানজট নিয়ন্ত্রণ, মিটিং-মিছিলের উপর নজরদারি—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় রাস্তার মোড়ে বসানো ক্যামেরা। কিন্তু ক্যামেরার ভিডিওর লাইভ ফিড যদি কন্ট্রোল রুমে না আসে, তাহলে কার্যত অচল হয়ে যায় গোটা নজরদারি ব্যবস্থা।
পুলিশ সূত্রে খবর, সম্প্রতি রাজ্য পুলিশের অভ্যন্তরীণ অডিটে এমনই একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। কোথাও ক্যামেরা রয়েছে। কিন্তু কন্ট্রোল রুমে তার লাইভ ছবি পৌঁছচ্ছে না। কোথাও আবার ক্যামেরায় ব্যবহৃত সিম নেওয়া হয়েছে সিভিক ভলান্টিয়ারদের নামে। সেই সিমে দীর্ঘদিন রিচার্জ না হওয়ায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবাও।
সূত্রের দাবি, আগের সরকারের আমলে বিভিন্ন জায়গায় ঢাকঢোল পিটিয়ে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। ক্যামেরাগুলি বসানোর পর কয়েক মাস ঠিকঠাক কাজও করে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একের পর এক ক্যামেরা বিকল হতে শুরু করে। ভবানী ভবন সূত্রের খবর, ক্যামেরাগুলির বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থার সঙ্গে চুক্তি সময়মতো পুনর্নবীকরণ করা হয়নি। অথচ সরকারি নথিতে সবকিছু ঠিকঠাক দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ। এমনকি ক্যামেরা মেরামতের নামে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা খরচ দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট জেলাগুলির তরফে সেই খরচের হিসাবও জমা দেওয়া হয়েছে।
ক্যামেরার লাইভ ফিড থানা বা কন্ট্রোল রুমে পৌঁছনোর জন্য ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সূত্রের দাবি, এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বহু জায়গায় সেই ইন্টারনেটের রিচার্জ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ক্যামেরা থাকলেও সেখান থেকে আর কোনও লাইভ ছবি পৌঁছত না থানায় বা কন্ট্রোল রুমে। অর্থাৎ এলাকায় কী ঘটছে, তা দেখার সুযোগই থাকত না পুলিশের।
আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, মাসের পর মাস ইন্টারনেট রিচার্জ করা হয়েছে দেখিয়ে সরকারি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।কিছু থানার বাইরে বসানো এক বা দু’টি ক্যামেরার ইন্টারনেট সংযোগ নেওয়া হয়েছিল সিভিক ভলান্টিয়ারদের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে। ফলে ওই ক্যামেরাগুলির মালিকানাও সরাসরি সরকারের নামে ছিল না বলে সূত্রের দাবি।
রাজ্য পুলিশের এক আধিকারিকের দাবি, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উপর নজরদারির জন্যও কিছু ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। এর মধ্যে বেশ কিছু ক্যামেরা চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সেই ঘটনায় থানায় জিডি করে বিষয়টি নথিভুক্ত করে রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ অডিটে উঠে আসা এই তথ্য ঘিরে এখন একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। ক্যামেরার লাইভ ফিড যে দিনের পর দিন কন্ট্রোল রুমে আসছে না, তা কি সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকদের জানা ছিল না? নাকি বিষয়টি জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? ক্যামেরা রক্ষণাবেক্ষণ, ইন্টারনেট রিচার্জ এবং মেরামতের নামে সরকারি অর্থ খরচের হিসাব নিয়েও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।
অভ্যন্তরীণ অডিটের পর এবার ব্যবস্থা নেওয়ার পথে রাজ্য পুলিশ। ভবানী ভবন সূত্রের খবর, কোন কোন জেলায় কতগুলি ক্যামেরা খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে, তার তালিকা তৈরি করা হয়েছে।খারাপ ও অচল ক্যামেরাগুলি সরিয়ে নতুন ক্যামেরা বসানো হবে। পাশাপাশি ক্যামেরার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নতুন সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
প্রতিটি জেলাকে নিয়মিত সিসি ক্যামেরা স্টেটাস রিপোর্ট দিতে হবে। ইন্টারনেট সংযোগ ও সিমকার্ডও এবার জেলার নামে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতি মাসে সিমে রিচার্জ হচ্ছে কি না, তার উপর নজরদারি চালাবে ভবানী ভবন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কোনও ক্যামেরা থেকে কন্ট্রোল রুমে লাইভ ছবি না এলে তার কারণও লিখিতভাবে জানাতে হবে জেলা পুলিশকে। অর্থাৎ, ক্যামেরা শুধু রাস্তার মোড়ে থাকলেই হবে না—তার ছবি পৌঁছতে হবে পুলিশের কন্ট্রোল রুমে। এবার সেই ব্যবস্থাই কড়া হাতে নজরদারির আওতায় আনতে চাইছে রাজ্য পুলিশ।