বিভাস ভট্টাচার্য: পড়ে গিয়েছে ঢাকে কাঠি। পুজোর ঢাক বাজার আগেই রাজ্যে বেজে গিয়েছে দুই বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের 'ঢাক'। যার মধ্যে একটি হল পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম। যেখানকার জয়ী বিজেপি প্রার্থী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। যদিও তিনি এই আসনের পাশাপাশি লড়াই করেছেন কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেও। সেখানকার আসনটি ধরে রেখে পদত্যাগ করেছেন নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। স্বাভাবিকভাবেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পদত্যাগের পরেই এই কেন্দ্রে বেজে উঠেছে উপনির্বাচনের ঢাক। সেইসঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগর বিধানসভার জয়ী প্রার্থী আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরের পদত্যাগের পর সেখানেও হতে চলেছে উপনির্বাচন। তফাৎ হল রেজিনগরে কংগ্রেসের তরফে প্রাপ্ত ভোট 'নোটা'র থেকে অন্তত বেশি ছিল। কিন্তু নন্দীগ্রামে কংগ্রেস হেরে গিয়েছিল নোটার কাছেও।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনটা ছিল 'হয় তৃণমূল নয় তৃণমূল'-এর একটা লড়াই। বিজেপি যেখানে শোচনীয়ভাবে ঘাসফুল শিবিরকে হারিয়ে রাজ্যে পালাবদল ঘটিয়েছে। সেই নির্বাচনে একমাত্র মুর্শিদাবাদ জেলা ছাড়া জাতীয় কংগ্রেসকে আর কোথাও ইভিএম-এ সেভাবে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। এককভাবে প্রার্থী দেওয়া কংগ্রেসকে দুরবিন দিয়ে জেলায় জেলায় 'খুঁজতে' হয়েছিল। নন্দীগ্রাম তার ব্যতিক্রম নয়। সেখানকার কংগ্রেস প্রার্থী শেখ জরিয়াতুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৭৯৪টি ভোট। অন্যদিকে নোটায় ভোট পড়েছিল ৯১৯টি।
নন্দীগ্রাম এলাকার কংগ্রেসের একটি সূত্রের মতে, প্রথমত এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনটা ছিল একেবারেই তৃণমূল বনাম বিজেপির মধ্যে। ফলে সেখানে কোনোভাবেই কংগ্রেস লড়াইয়ে ছিল না। কারণ, ওখানকার স্থানীয় মানুষের মধ্যে এই ধারণা গড়ে উঠেছিল এখানকার যিনি বিজেপি প্রার্থী হয়েছেন তিনিই রাজ্যের পরবর্তী সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী। দ্বিতীয়ত, বুথ স্তরে কংগ্রেসের বলতে গেলে সংগঠন বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। ভোটারদের 'হাতমুখী' করে তোলার জন্য যে প্রচেষ্টাটা দরকার সেটা কংগ্রেস আদপেই করে উঠতে পারেনি। যার পিছনে একটা বড় কারণ যদি হয় প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সঙ্কট দ্বিতীয়টি অবশ্যই কর্মীদের অভাব। গ্রাম বা পাড়া স্তরে কংগ্রেস তাদের কর্মীদের সংখ্যা বাড়াতে পারেনি। যার অন্যতম প্রভাব পড়েছে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও। এপ্রিল মাসে বিধানসভা নির্বাচনে যিনি নন্দীগ্রাম থেকে হাত চিহ্নে লড়াই করেছেন তিনি নন্দীগ্রাম বিধানসভা এলাকার বাসিন্দা নয়। স্থানীয় এক কংগ্রেস নেতার কথায়, কলকাতায় বিরোধী রাজনীতি করা এবং গ্রামে বিরোধী রাজনীতি করার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। কলকাতায় শাসকদলের চোখ রাঙানির খবর প্রচার হতে বেশি সময় লাগে না। কিন্তু গ্রামে সেটা হয় না বললেই চলে। ফলে 'ভয়'টা কিন্তু সবসময়ই থাকে। সেখানে দাঁড়িয়ে কর্মীদের সাহস জোগানোটাই কিন্তু শক্ত চ্যালেঞ্জ।
এই কেন্দ্রে ঘুরে দাঁড়াতে এবার কংগ্রেস বেশ কিছুটা সময়ের আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছে। কলকাতা থেকে এই বিধানসভা কেন্দ্রে শিবির গড়ে পড়ে আছেন রাজ্য কংগ্রেস নেতা রণজিৎ মুখার্জি। তিনিই এই কেন্দ্রে হাত শিবিরের পর্যবেক্ষক। চলছে পাড়া বা বুথ স্তরে ছোট ছোট সভা। বিজেপির আমলে দেশের মানুষের অবস্থা এবং কংগ্রেস আমলে সেই অবস্থার তুলনা করে মানুষকে কংগ্রেসের দিকে টেনে আনতে চলছে প্রচার। কর্মী সভায় ইতিমধ্যেই দাবি উঠেছে, এবার আর বাইরের কেউ নয়। ভূমিপুত্র কাউকে প্রার্থী করতে হবে এই উপনির্বাচনে। পর্যবেক্ষক রণজিৎ নিজেও এই কেন্দ্রে বিরোধী দলের চ্যালেঞ্জটা উপভোগ করছেন বলেই দাবি করেছেন। তাঁর কথায়, "রেজিনগরের মতো এই কেন্দ্রেও কংগ্রেস সর্বশক্তি দিয়েই লড়াই করবে। ভারতবর্ষে কংগ্রেসের যে কোনও 'বিকল্প' হয় না সেটা আজ প্রমাণিত। মানুষের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে। সেই ক্ষোভকে ইভিএম পর্যন্ত টেনে নিয়ে আসাটাই আমাদের লক্ষ্য। কংগ্রেস যার জন্য তৈরি।"