দিল্লির সত্য নিকেতনে বহুতল সাত জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছে, ভেঙে পড়া ভবনটি ‘Hostel Daze’ নামে একটি PG হিসেবে চালাতেন দুই ব্যবসায়ী। গুপ্তাদের সঙ্গে পার্টনার ছিলেন তাঁরা। ২০২৫ সালের অগস্টে তাঁরা বাড়িটি লিজ় নিয়েছিলেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন বাড়ির মালিকের ছেলে মহেশ গুপ্ত। এই দুই PG অপারেটরের ভূমিকা এখন খতিয়ে দেখছে। তাঁদের মধ্যে একজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আটক নির্মাণকাজের ঠিকাদারও।
ধৃত মহেশের দাবি, ২০২৫ সালের অগস্ট মাস থেকে বিল্ডিংটি শুভম ত্যাগী ও সুধাংশু নামে দুই ব্যবসায়ীকে ইজ়ারা দেওয়া হয়। তদন্তে জানা গিয়েছে, এই দুই ব্যবসায়ীই ‘Hostel Daze’ চালাতেন। বুধবার সকালেই সুধাংশুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অপর অপারেটর শুভম ত্যাগী এখনও পলাতক বলে তদন্তকারীদের সূত্রে খবর।
তবে তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সামনে এসেছে। বিল্ডিংটির সংস্কার ও নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা শ্রমিক ঠিকাদার সানোজকে উত্তরপ্রদেশের কাসগঞ্জ থেকে আটক করেছে পুলিশ। তাঁকে দিল্লিতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অভিযোগ, দুর্ঘটনার আগে ওই বহুতলের বেসমেন্টে যে ‘মেরামতির’ কাজ চলছিল, সেটির তদারকি করছিলেন সানোজ। দুর্ঘটনার আগে সেখানে কী ধরনের কাজ চলছিল—এই সমস্ত বিষয়েই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশের জেরায় মহেশ গুপ্ত জানিয়েছেন, তাঁর বাবা-মায়ের নামে থাকা বিল্ডিংটি ২০২৫ সালের অগস্টে Hostel Daze-এর দুই অপারেটরকে লিজ় দেওয়া হয়েছিল। ওই দুই ব্যক্তি বর্তমানে পলাতক বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তাঁদের ভূমিকা এবং দুর্ঘটনার আগে বিল্ডিংয়ে কী ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, ওই ভেঙে পড়া বহুতলের নীচের তলায় দু’টি দোকানকে একত্রিত করে বড় করার কাজ চলছিল। এই নির্মাণকাজের সময়ে কোনও লোড-বিয়ারিং দেওয়াল সরিয়ে ফেলা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তদন্তকারীদের আশঙ্কা, এই ধরনের পরিবর্তন বিল্ডিংয়ের কাঠামোগত স্থিতিশীলতা দুর্বল করে দিতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, বর্ষার সময়ে জল ও আবর্জনা জমে যাওয়ায় গত ৮-১০ দিন ধরে বেসমেন্টে মেরামতির কাজ চলছিল। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য নীচের তলায় সম্প্রসারণের কাজও হচ্ছিল। দুর্ঘটনার সঙ্গে এই নির্মাণকাজের কোনও সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো বিল্ডিংটি আগে থেকেই কাঠামোগত ভাবে কতটা নিরাপদ ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের FIR-এ অভিযোগ, বাড়ির মালিকরা ভাড়া থেকে বেশি আয় করার জন্য পুরোনো কাঠামোর উপরে অতিরিক্ত চারটি তলা তৈরি করেছিলেন, যদিও বহুতলে ভিত সেই অতিরিক্ত ভার বহন করার মতো শক্তিশালী ছিল না বলে তাঁরা জানতেন।
পুলিশের তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার সময়ে ওই PG-তে প্রায় ১৫ জন পড়ুয়া থাকতেন। তাঁদের কাছ থেকে প্রতি বেডে মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা করে নেওয়া হতো। খাবার ও Wi-Fi-সহ অন্যান্য পরিষেবা মিলিয়ে PG অপারেটরদের মাসিক আয় প্রায় ২.২৫ লক্ষ টাকা ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। চুক্তি অনুযায়ী, মালিক পরিবারকে মাসে এক লক্ষ টাকারও বেশি ভাড়া দেওয়া হতো।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই বাড়ির মালিক হরিরাম গুপ্ত, তাঁর স্ত্রী উর্মিলা গুপ্ত এবং ছেলে মহেশ গুপ্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন। রাজস্থানের ভিওয়াড়ি থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। হরিরাম ও উর্মিলাকে ১৪ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে, আর মহেশকে দু’দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠায় আদালত।
রবিবারের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পাঁচ পড়ুয়া এবং দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আরও কয়েক জন আহত হন। উদ্ধারকাজ শেষ হলেও এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন—কার নির্দেশে ভবনে নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ চলছিল, PG অপারেটররা কতটা দায়ী এবং প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কী ভাবে ওই বহুতলে এত জন ছাত্র থাকছিল? তদন্তকারীরা সেই প্রশ্নগুলিরই উত্তর খুঁজছেন।