চার মাসে ২২ জনকে ফাঁসির সাজা দিয়ে সম্প্রতি বিতর্ক জড়িয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগর আদালতের বিচারক রবিকুমার দিবাকর। এই পরিসংখ্যান উঠে আসার পরে তাঁর এজলাস থেকে অন্তত ১০০ মামলা সরিয়ে নেওয়া হয়। গত সোমবার ২৩তম ফাঁসির সাজা শুনিয়ে সেই বিচারক দাবি করলেন, তাঁকে লাগাতার খুনের হুমকি দিচ্ছে গ্যাংস্টার-মাফিয়ারা। আদতে তাদের বাঁচাতেই তাঁর এজলাস থেকে এতগুলি মামলা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এই হুমকিতে তিনি কখনওই দমে যাবেন না বলে জানিয়ে বিচারক বলেন, ‘কাপুরুষ বিচারক হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো!’
২০১৮ সালে স্ত্রী শাহজ়াদিকে পুড়িয়ে মারার অপরাধে তাঁর স্বামী নাদিমকে গত সোমবার মৃত্যুদণ্ড দেন মুজফ্ফরনগরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক দিবাকর। ৩৮ পৃষ্ঠার সেই রায়েই তিনি জানিয়েছেন, তাঁর এজলাস থেকে অন্তত ১০০টি মামলা সরে যাওয়ার পরেই তাঁকে হুমকি-বার্তা পাঠানো হয়েছে। মিডলম্যানদের মাধ্যমে তাঁকে বলা হয়েছে, ‘এখন তো শুধু মামলা সরেছে। আপনি যদি আমাদের পিছনে পড়েন বা আমাদের নিয়ে কোনও মন্তব্য করেন, আমরা প্রভাব খাটিয়ে এই জেলা থেকেই আপনার বদলি করে দেব।’
বিচারকের অভিযোগ, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বেশ কয়েক জন গ্যাংস্টারের মাথায় রাজনৈতিক নেতাদের হাত রয়েছে। সেই কারণে এই অপরাধচক্রের জাল প্রশাসনিক কাঠামোর একেবারে শীর্ষস্তরে পৌঁছে গিয়েছে। বিচারকের বক্তব্য, যে দিন থেকে তিনি মাফিয়া-গ্যাংস্টারদের ভয় পেতে শুরু করবেন, সে দিন অবসর নিয়ে নেওয়াই ভালো। এ সব নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তাঁর দু’জন নিরাপত্তারক্ষীকেও বদলে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিচারক দিবাকর। তিনি জানিয়েছেন, এই বিষয়টি নিয়ে তিনি ইতিমধ্যেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশের ডিজি-কে চিঠি লিখেছেন।
বিচারকের হুমকির অভিযোগ ঘিরে প্রত্যাশিত ভাবেই শোরগোল পড়েছে সর্বত্র। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় এই সময় অনলাইন-কে বলেন, ‘এ রকম খুনের হুমকি অনেক বিচারপতি বা বিচারকই পেয়ে থাকেন। এটা এই পেশার একটা ঝুঁকি। এই ঝুঁকির মধ্যেই নিজেদের কাজ করেন বিচারকেরা। নিজের কর্তব্যে অবিচল থাকেন। কাপুরুষ বিচারক হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো— ওঁর এই বক্তব্যকে পূর্ণ সমর্থন করি। এক জন বিচারকের যা বলা উচিত, উনি তা-ই বলেছেন।’
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে উত্তরপ্রদেশ বিচার বিভাগে বিচারক হিসাবে যোগ দেন দিবাকর। সুলতানপুর, বদাউন, বারাণসী, বরেইলি জেলা আদালতে কাজ করেছেন তিনি। মুজফ্ফরপুর আদালতে রয়েছেন ২০২৫ সাল থেকে। ২০২২ সালে প্রথম বার সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে শিরোনামে এসেছিলেন বিচারক দিবাকর। তিনিই জ্ঞানবাপী মসজিদ চত্বরে ভিডিয়োগ্রাফিক সমীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভিযোগ, তার পরে খুনের হুমকিও পান। ২০২৪ সালের মার্চে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে প্লেটোর ‘ফিলোসফার কিং’-এর সঙ্গে তুলনা করেও বিতর্কে জড়িয়েছিলেন বিচারক দিবাকর। সম্প্রতিই একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসে। দেখা যায়, বিচারক গত চার মাসে ১০টি মামলায় মোট ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ঠিক তার পরেই, গত অগস্ট মাসে খুন-সহ গুরুতর অপরাধ সম্পর্কিত অন্তত ১০০টি মামলা বিচারক দিবাকরের এজলাস থেকে বিচারক বীরেন্দ্রকুমার সিংয়ের এজলাসে পাঠানো হয়।