• মেলেনি প্রশাসনের সাহায্য, গ্রামবাসীদের টাকায় মিলল নতুন সেতু
    এই সময় | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • দিব্যেন্দু সরকার, আরামবাগ

    দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের দোরগোড়ায় ঘুরেও কোনও কাজ হয়নি। ভোট যখন আসে নেতারা নিয়ম করে আশ্বাস দিয়ে যান। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। তার ফল ভোগ করতে হয় গ্রামের মানুষকে। তাই সমস্যা নিরসনে এগিয়ে এলেন গ্রামের সাধারণ মানুষরাই। হুগলির খানাকুলের বালিপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কণকপুরে গ্রামবাসীরা নিজেরাই চাঁদা তুলে হরিণাখালি খালের উপরে তৈরি করলেন নতুন সেতু। তাতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীরা মহিলারা। তাঁরা ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে সেতু তৈরির জন্য ২০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ভবিষ্যতে টোল আদায় করে সেই টাকা পরিশোধ করবেন তাঁরা।

    স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এতদিন তাঁরা বাঁশের সাঁকোর উপর দিয়ে যাতায়াত করতেন। কেউ আবার নৌকোয় নদী পারাপার করতেন। কিন্তু বর্ষকালে নদীর জলের তোড়ে বাঁশের সাঁকো ভেঙে গেলে দুই পারের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যেত। তার ফলে বালিপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন প্রায় ৭-৮টি গ্রামের মানুষ ঘোরতর বিপাকে পড়তেন। সাঁকো দিয়ে গর্ভবতী মহিলা কিংবা অসুস্থ রোগীদের নিয়ে যাওয়া রীতিমতো ঝক্কির ব্যাপার ছিল।

    তার জেরে একাধিক বার মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে রাজ্যের প্রাক্তন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এখানে কংক্রিটের সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও সেই প্রতিশ্রুতি আজও পূরণ হয়নি। সরকারি অবহেলা ও নেতা-মন্ত্রীদের উদাসীনতা দেখেই গ্রামবাসীরা নিজেরাই ইস্পাতের সেতু তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। তারপরই শুরু হয় সেতু নির্মাণের কাজ। বর্তমানে সেতুর উপর দিয়ে টোটো, সাইকেল ও বাইক যাতায়াত করছে। সেতু নির্মাণে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় ৮৭ লক্ষ টাকা। তবে এখনও সেতুর পিলারের গার্ডওয়ালের ঢালাইয়ের কাজ বাকি রয়েছে। রঙের কাজও বাকি আছে। অ্যাপ্রোচ রোড তৈরির কাজও অসম্পূর্ণ। তার জন্য আরও অর্থ লাগবে।

    গ্রামবাসীদের অভিযোগ, নির্মাণ চলাকালীন তৎকালীন শাসকদলের নেতাদের হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁদেরকে। সেচ দপ্তরের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় এনওসি-ও জোগাড় করতে গিয়েও অনেক সময় ব্যায় হয়েছে। তা সত্ত্বেও জেদ ধরে বসেছিলেন গ্রামবাসীরা। গত রবিবার সেই সেতুর উপর থেকেই বন্যা পরিদর্শন করেন রাজ্যের সেচমন্ত্রী অরূপকুমার দাস, হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদেরি এবং পুরশুড়া ও আরামবাগের দুই বিধায়ক।

    ভৌগলিক দিক থেকে জায়াটি খানাকুল থানার অন্তর্গত হলেও, সেটি পুরশুড়া বিধানসভার অধীনে পড়ে। গ্রামবাসীদের এই উদ্যোগকে কুর্নিশ জানিয়েছেন পুরশুড়ার বিধায়ক। তিনি গ্রামবাসীদের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, এই এলাকাটি অনেকটা দ্বীপের মতো। কিছুটা দূরেই বালিপুরের কাছে মুণ্ডেশ্বরী দু'টি ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। গোটা এলাকাটাই নদীদ্বারা বেষ্টিত। তার আশপাশেই রয়েছে দুর্গাপুর, তাঁতিশাল, কণকপুর, বালিপুর, জাকরি, সারদা-সহ একাধিক গ্রাম।

    স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য লক্ষ্মীরানি জানা বলেন, 'আমরা চারটি গ্রুপ থেকে মোট ২০ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছি। সেই টাকা সেতু নির্মাণের জন্য দিয়েছি। জানি না, কী ভাবে এই টাকা শোধ করব। বর্তমান সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা না করে, তা হলে আমরা টোল আদায় টাকা আদায়ের চেষ্টা করব। কারণ, ব্যাঙ্ক থেকে যে ঋণ আমরা নিয়েছি, সেটা সময়ের মধ্যে শোধ করতে হবে আমাদেরকে।' স্বনির্ভর মহিলা গোষ্ঠীর আর এক সদস্য অতসী আদক বলেন, 'আমরা ঝুঁকি নিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়েছি। তাই বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, সেতু বানাতে যে টাকা খরচ হয়েছে, সেটা আমাদেরকে দেওয়া হোক। তবেই আমরা ঋমমুক্ত হতে পারব।' বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী সুস্মিতা মান্না বলেন, 'এই সেতু তৈরি হওয়ায় ছাত্রছাত্রীরা খুব উপকৃত হয়েছে। নইলে অনেক সময় আমাদের নৌকো পারাপার করতে হতো। সবসময় নৌকো পাওয়া যেত না।'

    স্থানীয় বিধায়ক বিমান ঘোষ বলেন, 'আমাদের কাছে ওঁরা টাকার জন্য আবেদন করেছেন। আমরা মুখ্যমন্ত্রী ও সেচমন্ত্রীকে বিষয়টি জানাব। গ্রামের মানুষরা একটা ভালো কাজ করেছেন। আমরা ওঁদের পাশে আছি।'

  • Link to this news (এই সময়)