এক তরুণের সঙ্গে মেয়ের ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই তুঙ্গে ওঠে পরিবারের ক্ষোভ। এর পরেই পরিবারের ‘সম্মান’ ধুলোয় মিশে গিয়েছে এই অভিযোগে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয় আত্মীয়দের মধ্যে। অভিযোগ, পরিবারের নাম ধুলোয় মেশানোর অপরাধে নিজেদের মেয়েকে চরম শাস্তি দিলেন বাবা-দাদাই। গুজরাটের আমেদাবাদে সোফিয়া ফারুকের খুনে উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২২ বছরের তরুণীকে খুনের অভিযোগ উঠল খোদ তাঁর বাবা ও দাদার বিরুদ্ধে। প্রাথমিক ভাবে ঘটনাটিকে ‘হিট অ্যান্ড রান’ বলে চালানোর চেষ্টা হলেও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ, পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে পরিকল্পনা করে সোফিয়াকে খুন করা হয়। পরে প্রমাণ লোপাট করতে গোটা ঘটনাকে পথ দুর্ঘটনার চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনাটি গত ১২ অগস্ট রাতের। সোফিয়া আমেদাবাদের সারখেজ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন এবং জুহাপুরার একটি হাসপাতালে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। ওই রাতে তাঁর ৩৮ বছরের দাদা মহম্মদ হাবিল ফারুক তাঁকে মোটরবাইকে নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ ছিল, গেহলজিপুরা গ্রামের কাছে তাঁদের মোটরবাইকে পিছন থেকে একটি দ্রুতগতির গাড়ি ধাক্কা মারে। ধাক্কায় সোফিয়া গুরুতর আহত হন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৩ অগস্ট রাত ১২টা ৫ মিনিট নাগাদ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রথমে ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, ততই বদলে যেতে থাকে গোটা ছবিটা।
পুলিশের সন্দেহ তৈরি হয় ঘটনাস্থলের CCTV ফুটেজ পরীক্ষা করার পরে। পরিবারের তরফে যে জায়গায় দুর্ঘটনার কথা বলা হয়েছিল, সেখানে কোনও দুর্ঘটনা ঘটার প্রমাণ মেলেনি। বরং রাস্তার পাশের CCTV ফুটেজে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যায়, যা পরিবারের দেওয়া বয়ানের সঙ্গে মেলেনি।
তদন্তকারীদের দাবি, এর পরেই তাঁরা দুর্ঘটনার তত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। সোফিয়ার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ধীরে ধীরে সামনে আসে তাঁর সঙ্গে এক যুবকের একটি ভিডিয়োর প্রসঙ্গ।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে এক যুবকের সঙ্গে সোফিয়ার একটি ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ভিডিয়ো নিয়ে পরিবারের সদস্যরা তাঁর উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে অভিযোগ। বিশেষ করে তাঁর বাবা ৫৬ বছরের মহম্মদ ফারুক নওয়াবখান এবং দাদা হাবিল ওই ভিডিয়ো নিয়ে সোফিয়াকে ব্যাপক বকাঝকা করেছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। পুলিশের সন্দেহ, ওই ঘটনার জেরেই সোফিয়াকে ‘পরিবারের সম্মান’ রক্ষার নামে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ১২ অগস্ট রাতে বাবা ও ছেলে সোফিয়াকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। কিছুটা যাওয়ার পরে হাবিল মোটরবাইকটি গেহলজিপুরা গ্রামের কাছে একটি নির্জন কাঁচা রাস্তায় নিয়ে যান বলে অভিযোগ। সেখানেই তাঁর হাতে থাকা হাতুড়ি দিয়ে সোফিয়ার মাথায় পরপর তিনবার আঘাত করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
মাথায় গুরুতর আঘাতের ফলে সোফিয়ার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও মাথায় আঘাতের কারণে ব্রেন হেমারেজের কথা উঠে এসেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযোগ, সোফিয়াকে মারাত্মক ভাবে আহত করার পরে তাঁর বাবা ও দাদা তাঁর দেহ মোটরবাইকে করে মূল রাস্তার কাছে নিয়ে আসেন। মোটরবাইকটিকেও এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, যাতে মনে হয় পিছন থেকে কোনও গাড়ি ধাক্কা মেরেছে।
এর পরে হাবিল পুলিশকে জানান, একটি অজ্ঞাত গাড়ি তাঁদের মোটরবাইককে পিছন থেকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে গিয়েছে। তাঁর দাবি ছিল, সেই দুর্ঘটনাতেই সোফিয়ার গুরুতর চোট লাগে। নিজেও দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছিলেন। কিন্তু CCTV ফু়টেজ সেই গল্পে কার্যত জল ঢেলে দেয়।
তদন্তের মোড় ঘুরে যাওয়ার পরে মামলাটি ট্রাফিক পুলিশের হাত থেকে সারখেজ থানায় যায়। পুলিশ সোফিয়ার বাবা মহম্মদ ফারুক এবং দাদা মহম্মদ হাবিলকে গ্রেপ্তার করেছে বলে একাধিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
পুলিশ এখন হত্যায় ব্যবহৃত হাতুড়িটি উদ্ধারের চেষ্টা করছে। প্রাথমিক তদন্তে এটিকে ‘অনার কিলিং’ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে তদন্ত এখনও চলছে এবং মামলার সমস্ত অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়া বাকি।