বাবলু সাঁতরা ঘাটাল
'... তোমায় নিয়ে বিপদ বড় কোথায় তোমায় খুঁজি। চলো তোমায় করছি ফলো তস্য গলিঘুঁজি...।' 'চন্দ্রবিন্দু' এ গান গেয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। তবে বুধবার সকালে ঘাটালের ফতেপুর যে দৃশ্যের সাক্ষী থাকল তা 'রিল' নাকি 'রিয়াল' তা বলতে গিয়ে এখনও গুলিয়ে ফেলছেন অনেকে।
ঘাটালের দীর্ঘগ্রাম এলাকা থেকে ঝুমি নদী হয়ে চোলাই পাচার হচ্ছে হুগলির বিভিন্ন এলাকায় আবগারি দপ্তরের কাছে এ খবর আছে ঢের আগে থেকেই। সেই মতো সতর্ক থাকেন আবগারি দপ্তরের কর্মীরা। তক্কে তক্কে থাকে চোলাই কারবারিরাও। ফলে, নিত্যদিন 'চোর-পুলিশ খেলা' চলতেই থাকে। কখনও জয়ীর হাসি হাসে পাচারকারীরা। কখনও আবার 'সাদা পোশাকের' কেরামতিতে জলে যায় পাচারকারীদের সব প্ল্যান।
যেমনটা ঘটল বুধবার। পরনে সাদামাটা প্যান্ট, টি-শার্ট। পায়ে চপ্পল। কারও মাথায় গামছার পাগড়ি। কেউ আবার কষে বেঁধে নিয়েছেন কোমরেই। ওঁরা যে আবগারি দপ্তরের কর্মী তা চেনার জো ছিল না। গ্রামের লোকজনও ভেবেছিলেন, হবে কোনও সাধারণ পথচারী। কিন্তু, 'খেলা' জমে গেল একটু পরেই। সাইকেলের হ্যান্ডলে চোলাইয়ের পাউচভর্তি ব্যাগ নিয়ে জনা পাঁচেক লোক ঝুমিনদী পেরিয়ে হাজির হয় ফতেপুরে। তাদের গন্তব্য হুগলির কুলোট।
আচমকা ভেসে এল বিশেষ সিগন্যাল- তীক্ষ্ণ শিস। অর্থাৎ, এখনই 'অপারেশন' শুরু করতে স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, 'চোলাই ঠেকে অভিযান চালিয়ে, রাস্তা থেকে পাচারকারীকে হাতেনাতে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য অনেক দেখেছি। কিন্তু, এ ভাবে ছদ্মবেশে কোমরজলে দৌড়ে আবগারি দপ্তরের কর্মী চোলাই পাচারকারীকে ধরছেন- এমন দৃশ্য এই প্রথম দেখলাম।' ফতেপুরের এক বাসিন্দার কথায়, 'হঠাৎ দেখি,জনা পাঁচেক লোক রাস্তায় সাইকেল ফেলে পাশের জলাশয়ে ঝাঁপ দিল। তাদের ধরতে আর একজন লোকও জলে ঝাঁপ দিলেন। তিনিই একজনকে ধরে ফেলেন। পরে জানতে পারি, পিছু ধাওয়া করা ওই ব্যক্তি আসলে আবগারি দপ্তরেরই কর্মী। তিনি সাদা পোশাকে ছিলেন বলে আমরা কেউ টেরই পাইনি।'
আবগারি দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘাটালের দীর্ঘগ্রাম এলাকায় চোলাই তৈরির কারবার চলে। সেখান থেকে পাউচভর্তি চোলাই পাচার হয়ে যায় হুগলির কুলোট এলাকায়। বুধবার সাতসকালে আবগারি দপ্তরে খবর যায়- 'ও স্যর, দীর্ঘগ্রাম থেকে পাঁচ জন এইমাত্র চোলাই নিয়ে বেরোল।' তড়িঘড়ি একটি দল সাদা পোশাকে ঝুমিনদী পেরিয়ে পৌঁছে যায় ফতেপুরে। 'সোর্স' মারফত পাওয়া খবর অনুযায়ী, কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হয় পাঁচ পাচারকারী। পিছু নেন ওই দলের সদস্যরা। পাচারকারীরাও টের পায়, পিছনে 'পুলিশ'। ভয়ে সাইকেল ফেলে পাশের জলাশয়ে ঝাঁপ দেয় পাঁচ জনই। ধরা পড়ে একজন।
ঘাটাল আবগারি দপ্তরের ওসি সুভাষ হালদার আরও একটি টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছন। উদ্ধার হয় পাচারকারীদের ফেলে যাওয়া পাঁচটি সাইকেল, ৯০০ লিটার চোলাই। ধৃতকে এ দিন ঘাটাল আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক তাকে সাত দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। আবগারি দপ্তরের ঘাটাল সার্কেলের ওসি সুভাষ হালদার বলেন, 'চোলাইয়ের কারবার রুখতে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। গত দু'মাসে ২০ বারের বেশি তল্লাশি চলেছে। সেই কারণেই পাচারকারীরাও নিত্য নতুন পন্থা অবলম্বন করছে। তবে আমরাও সতর্ক আছি।'