অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
চার–পাঁচতলা বিল্ডিংগুলো গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। দু'টো বিল্ডিংয়ের মাঝে একহাতের ফাঁকও নেই৷ এক একটা তলায় গোটা ১০-১২ ঘর৷ পায়রার খোপ বললেই হয় অবশ্য। সেখানেও ঠাসাঠাসি ৫–৬টা করে বেড। এমনই এক একটা বেডের মাসিক ভাড়া গড়ে ১০,০০০ টাকা! একফালি ছোট শেয়ারিং বারান্দায় আবাসিক ছাত্র ও চাকুরিজীবীদের কাপড় শুকোনোর ব্যবস্থা৷ ঘরগুলোর মধ্যে একটাই জানালা, বহুক্ষেত্রে সেটাতেই বসানো উইন্ডো এসি! স্যানিটারি পাইপ সম্বলিত সরু শ্যাফ্ট ছাড়া আলাদা কোনও ভেন্টিলেশন নেই৷ এই শ্যাফ্ট সারাদিন বন্ধই থাকে, কারণ খুলে রাখলে মোটা মেঠো ইঁদুর ঘরে ঢুকে ছারখার করে দেবে সব কিছু! ছোট শৌচালয়ও বহুক্ষেত্রে 'কমন'।
এমন পায়রার খোপেই মাথা গুঁজে রয়েছে ভিন্রাজ্য থেকে দিল্লিতে পড়তে আসা হাজার হাজার পড়ুয়া। সম্প্রতি দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় 'হস্টেল ডেজ়' বহুতল ভেঙে সাত পড়ুয়ার মৃত্যুর পরে সেখানকার মেস বা পিজির দুরবস্থা নিয়ে অনেক কথাই হচ্ছে। কিন্তু উপরের যে বিবরণটি পড়লেন, সেটা সত্য নিকেতন এলাকার ছবি নয়। মুনিরকা, ওল্ড রাজিন্দর নগর, মুখার্জি নগর এবং লক্ষ্মীনগর— দিল্লির স্টুডেন্ট হাব হিসেবে পরিচিত এই চারটি এলাকাতেও এ ভাবেই হাজার হাজার পেয়িং গেস্ট (পিজি) ফেসিলিটি রমরমিয়ে চলছে, নিরাপত্তা বিধির তোয়াক্কা না করেই!
দিল্লির জেএনইউ এবং আইআইটি থেকে হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত 'মুনিরকা ভিলেজ'–এর একটি পিজিতেই দেখা মিলল মালদার রথবাড়ির আদি বাসিন্দা মেহবুব আলমের৷ মাস ছয়েকের বেশি সময় ধরে এখানে আছেন মেহবুব৷ ইউপিএসসি-র প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি৷ সত্য নিকেতনের ঘটনা শুনে ছুটে গিয়েছিলেন দেখতে৷ বললেন, 'দিল্লিতে এটে এটা বুঝে গেছি, এখানে বেঁচে থাকতে গেলে সবথেকে বেশি প্রয়োজন কপালের জোর৷ কোনও দোষ না করেও জঙ্গিহানায় প্রাণ যেতে পারে৷ কোটিপতির গাড়িতে চাপা পড়ে প্রাণ যেতে পারে৷ রাতে হস্টেলে ফেরার পথে ছিনতাইবাজের কবলে পড়ে প্রাণ যেতে পারে৷ আবার যে বাড়িতে বাস করছি, সেটা ভেঙে পড়েও প্রাণ যেতে পারে। পুরোটাই নসিব!'
ইন্দোরের শ্বেতা কুমারী একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত৷ কয়েকজন মহিলা সহকর্মীর সঙ্গে লক্ষ্মীনগরের সরু গলির মধ্যে একটি পাঁচ তলা বিল্ডিংয়ে থাকেন৷ তাঁর বক্তব্য, 'সত্য নিকেতন হোক বা লক্ষ্মীনগর, অবস্থা একই! সব বিল্ডিংয়েই একটি মাত্র সিঁড়ি৷ যদি হঠাত্ করে আগুন লাগে, ছাদে উঠে বাইরে লাফিয়ে পড়া ছাড়া আমাদের হাতে আর উপায় থাকবে না!' মুখার্জি নগর এলাকায় দেখা মিলল মণিপুর থেকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা একঝাঁক পড়ুয়ার৷ সবাই বহুতল বাড়িতে পিজি থাকেন৷ তাঁদেরই একজন, নিমিশা পামেই শোনালেন, 'আমাদের যা বাজেট, তাতে এই ধরণের পিজিতেই থাকতে হবে৷ অন্যান্য পশ এলাকায় আলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকার খরচ চালাতে পারব না৷ তা ছাড়া দিল্লির মতো জায়গায় আমাদের দল বেঁধে থাকার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে৷ আমরা উত্তর–পূর্বের বাসিন্দারা একেবারেই নিরাপদ নই, তার প্রমাণ বার বারই মিলছে৷'
ওল্ড রাজিন্দর নগরেরও একই অবস্থা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বেসরকারি সংস্থার কর্মী ছাড়াও এই এলাকায় সবথেকে বেশি থাকেন ইউপিএসসি, নিট–এর মতো প্রবেশিকার প্রস্তুতি নেওয়া পড়ুয়ারা৷ সত্য নিকেতনের দুর্ঘটনার পরে বুধবার দিল্লি পুরনিগমের প্রতিনিধিরা রাজিন্দর নগরে এসে বিভিন্ন পিজির নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন৷ বিহারের দানাপুর থেকে দিল্লিতে এসে ইউপিএসসি প্রিপারেশন নেওয়া বিনোদ কুমারের অবশ্য স্বগতোক্তি, 'ইঁহা কুছ নেহি বদলেগা৷ সব সেটিং হ্যায়৷ হামারে সাথ ওহি হোগা যো তকদির মে লিখা হোগা৷' (এখানে কিছুই বদলাবে না, সব সেটিং করা আছে। আমাদের ভাগ্যে যা আছে, তাই হবে)
ফেরার পথে দেখলাম সত্য নিকেতন এলাকার অন্য বিপজ্জনক বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। হাতুড়ি, বুলডোজ়ারের শব্দের মধ্যেই ব্যাগপত্র হাতে রাস্তায় এসে দাঁড়ানো ঠাঁইহারা কিছু ছেলেমেয়ে। অন্য পিজি–র খোঁজে হন্যে। কিন্তু সেটাও কি নিরাপদ হবে? ভিড় থেকেই মিলে গেল জবাব— দিল্লির বহুতল বাড়ি পায়রার খোপের মতো মেসে থাকা জেন জি়–দের 'ভাগ্য'ই এখন সবথেকে বড় সম্বল৷