এই সময়: কয়েকটা বই। কয়েকটা তাক। চারপাশে জড়ো হওয়া একদল শিশু। কারও বাড়িতে বই রাখার সামর্থ্য নেই, কারও স্কুলে পড়া বুঝতে সমস্যা হয়। সেই শিশুদের হাতেই বই তুলে দিয়ে পড়ার আনন্দ, কৌতূহল আর আত্মবিশ্বাস তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে জনকল্যাণকর সংস্থা ‘ট্রেজ়ার্স অফ ইনোসেন্স’ (টিওআই)। তাদের হাতিয়ার ‘ওয়াল লাইব্রেরি’। পশ্চিমবঙ্গের ২৬টি পিছিয়ে-পড়া এলাকায় এমন লাইব্রেরির মাধ্যমে ৩০০০-এর বেশি শিশুর কাছে পৌঁছেছে এই সংস্থা। শুধু স্কুলে ভর্তি করানো নয়, বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়েই ছোটদের শিক্ষার মূল স্রোতে ধরে রাখা লক্ষ্য টিওআই–এর।
এই লাইব্রেরির ভাবনার মূলে রয়েছে বইকে স্কুলের গণ্ডি থেকে বার করে শিশুদের হাতের নাগালে পৌঁছে দেওয়া। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্পের বই পড়ার সুযোগ তৈরি করে ভাষাজ্ঞান, কল্পনাশক্তি এবং নিজের ভাবনা প্রকাশের ক্ষমতা বাড়ানোই আসল উদ্দেশ্য। গল্প বলা, বইয়ের আলোচনা এবং নিজেদের ভাবনা প্রকাশেরও সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয় এখানে। ফলে পড়ার অভ্যাসের পাশাপাশি শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতাও বাড়ে। সংস্থার দাবি, মূল্যায়নে শিশুদের পড়া ও লেখার দক্ষতায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি লক্ষ্য করা হয়েছে। প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে দাদু-দিদা বা ঠাকুমা-ঠাকুরদার কাছ থেকে গল্প শোনারও ব্যবস্থা রয়েছে।
২০২৫–এ গড়িয়ায় রোটারি ক্লাব অফ ক্যালকাটা অ্যাভিয়ানার সহযোগিতায় টিওআই-এর একটি ‘হ্যাঙ্গিং লাইব্রেরি’ চালু হয়। অল্প পরিসরে বইকে আরও সহজলভ্য করাই যার লক্ষ্য। যে সব এলাকায় বাড়িতে বই রাখার সুযোগ কম, সেখানে এই উদ্যোগের গুরুত্ব বেশি। শিশু নিজের পছন্দের বই বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়, ফলে বাধ্যতামূলক কাজ না হয়ে পড়াশোনা হয়ে ওঠে আনন্দের অভিজ্ঞতা। বই ঘিরে তৈরি হয় প্রশ্ন, কথোপকথন ও কৌতূহল। আর সেই কৌতূহলই ধীরে ধীরে নিয়মিত শেখার অভ্যাসে পরিণত করার চেষ্টা করছে টিওআই।
লাইব্রেরির পাশাপাশি ‘ব্রিজ’ শিক্ষা কর্মসূচিও টিওআই-এর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্কুলের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান ও অঙ্কের মৌলিক ধারণা মজবুত করতে আলাদা ব্যাচে পাঠ দেওয়া হয়। নিয়মিত পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্টে অগ্রগতি দেখা হয়, প্রতিটি ব্যাচের জন্যে থাকেন মেন্টর। স্পোকেন ইংলিশ, আবৃত্তি, থিয়েটার, সৃজনশীল কাজ, শরীরচর্চা, সফট স্কিল এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়ও শেখানো হয়।
গড়িয়া, কালিকাপুর, বোলপুর ও কাকদ্বীপে বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্প চলছে। পরিবারকেও যুক্ত করা হচ্ছে কর্মসূচিতে। মায়েদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক, কিচেন গার্ডেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সচেতনতা কর্মসূচিতে তাঁদের অংশগ্রহণ রয়েছে। মহিলাদের পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বনির্ভরতার পথও তৈরি করা হচ্ছে। টিওআই-এর প্রতিষ্ঠাতা রানি ভবানী ‘এই সময়’–কে বলেন, ‘আমরা ছোটদের লাইব্রেরি তৈরি করতে শেখাচ্ছি। নিজেদের গল্প কী ভাবে নিজেদের তৈরি বইয়ে লিখে রাখা যায়, সেটাও শেখানো হচ্ছে। ছোটদের নিজেদের গল্পের সংকলন ‘স্বপ্নের তরী’–র প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। গ্লাভ পাপেট নিয়ে গল্প বলার কৌশলও শেখানো হচ্ছে ছোটদের।’