• 'নন্দীগ্রামেই দাঁড়ান না!' মমতাকে 'আমন্ত্রণ' বিদ্রোহীদের
    এই সময় | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়, কলকাতা ও নন্দীগ্রাম: ২০২১–এ শুভেন্দু অধিকারীর গড় বলে পরিচিত নন্দীগ্রামে তিনি নিজেই প্রার্থী হবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। আর বিজেপির প্রার্থী ছিলেন শুভেন্দু। ওই নির্বাচনে ১৯৫৬ ভোটে হেরেছিলেন মমতা। ২০২৬–এর নির্বাচনে আবার মমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে শুভেন্দু নিজেই পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের পাশাপাশি তৃণমূলনেত্রীর কেন্দ্র দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে প্রার্থী হয়ে জয়ী হন। সে বার তাঁর জয়ের মার্জিন ছিল ১৫,১০৫।

    এ বার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর ছেড়ে আসা নন্দীগ্রামে বিজেপির বিরুদ্ধে কি তৃণমূলের প্রার্থী হবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? এ বার কেউ তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানায়নি। বরং বিধানসভা নির্বাচনোত্তর পর্বে ভেঙে খানখান হয়ে যাওয়া মমতার হাতে গড়া দলের বিদ্রোহী শিবিরের তরফে তাঁকেই খোলাখুলি ‘আমন্ত্রণ’ জানানো হলো নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে লড়ার জন্য।

    বুধবার বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন‍ বিদ্রোহী শিবিরের তরফে বিধায়ক মদন‍ মিত্র এবং মুখপাত্র ঋজু দত্ত দু’জনেই বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে দাঁড়ালে তাঁরা আর প্রার্থী দেবেন না। শুধু তাঁরাই নন, একদা নন্দীগ্রাম আন্দোলনে মমতার বিশ্বস্ত সৈনিক বলে পরিচিত আবু তাহেরও বলেছেন, দলের ‘এই দুর্দিনে’ তিনিই তৃণমূলের প্রার্থী হোন। এ নিয়ে অবশ্য মমতা নিজে কোনও মন্তব্য করেননি। তবে কালীঘাট–তৃণমূলের মুখপাত্র, বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষের প্রতিক্রিয়া, ‘কে কী উদ্দেশ্যে কী বলছেন, তাকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনও মানে নেই। এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তৃণমূলের নেত্রী। কে প্রার্থী হবেন, তা তিনিই ঠিক করবেন।’

    এ দিন বিদ্রোহী তৃণমূলের তরফে মদন মিত্র বলেন, ‘নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিততে পারেননি। গণতন্ত্রে শাসকের বিরুদ্ধে বিরোধীরা যদি একজোট হয়ে লড়াই করেন, তা হলে গণতন্ত্রে মানুষ ভবিষ্যতের সন্ধান পায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা কতখানি আছে, তাতে না গিয়েই বলছি, উনি যদি নন্দীগ্রামে দাঁড়ান, তা হলে আমরা প্রার্থী দেবো না। এতে প্রমাণ হবে, বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট ভাগ করার কোনও সুযোগ আমরা তুলে দিইনি।’ তাঁর সংযোজন, ‘আরও একটা জিনিস প্রমাণ হবে— বিজেপির বি টিম আসলে কারা।’ আবার বিধানসভার গেটের বাইরে ঋজু বলেন, ‘যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে প্রার্থী হন, তা হলে তৃণমূল কংগ্রেস (বিদ্রোহী) কোনও প্রার্থী দেবে না। উনি ভবানীপুর থেকে নন্দীগ্রামে গিয়ে হেরেছেন। তারপরে তিনি নিজের ভবানীপুর কেন্দ্রে হেরেছেন। নিজের ছবি দিয়ে নিজের বুথে পর্যন্ত হেরেছেন। আবার তাঁর ছবি নিয়ে ভোটে প্রার্থী হয়ে ২৯৪–এর মধ্যে ২১৪ জন হেরেছেন। তাই আমাদের মনে হয়, একবার জিতলে ওঁর ভালো লাগবে। তাই নন্দীগ্রামে উনি প্রার্থী হলে আমরা কোনও প্রার্থী দেবো না, ওঁকেই সমর্থন করব।’

    নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে উপনির্বাচনের দিনক্ষণ সোমবারই ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বুধবার পর্যন্ত সেখানে বিজেপি–সহ কোনও দলই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে শুভেন্দু ইতিমধ্যে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের মার্জিন ডায়মন্ড হারবারের ফলতার থেকেও বেশি করার টার্গেট বেঁধে দিয়েছেন। বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলের দুই শিবির, কংগ্রেস, বামেরা প্রার্থী দিলে সেখানে লড়াই পঞ্চমুখী হতে পারে। এই উপনির্বাচনের আগে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ বা এআইটিসি নাম এবং ঘাসের উপরে জোড়াফুল প্রতীক কালীঘাট নাকি বিদ্রোহী শিবির— কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি নির্বাচন কমিশন। এই আবহে বিদ্রোহী শিবিরের তরফে মমতাকে প্রার্থী হওয়ার ‘আমন্ত্রণ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

    তৃণমূলের এই টানাপড়েন নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ বঙ্গ–বিজেপি নেতৃত্ব। দলের প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের কটাক্ষ, ‘কুচকুচে সাদা বা ধবধবে কালো, তৃণমূলে কেউ নয় ভালো। ওঁদের কে লড়বেন, কে লড়বেন না, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না।’

    নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অন্যতম মুখ আবু তাহের এখনও সরকারি ভাবে বিদ্রোহী তৃণমূ‍লে যোগ দেননি, রয়েছেন কালীঘাট শিবিরেই, তবে এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। তিনিও এ দিন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে বলেন, ‘নন্দীগ্রামে দলের কোনও প্রতিনিধি নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সুপ্রিমো। উনি নিজেই তা হলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে দাঁড়ান। আমরা সহযোগিতা করব।’ এরপরেই তাঁর ইঙ্গিতপূর্ণ সংযোজন, ‘দলের কারও সঙ্গে আলোচনা না করে উনি ২০২১–এ নিজেকে নন্দীগ্রামের প্রার্থী বলে ঘোষণা করেছিলেন। তার খেসারত ওঁকে দিতে হয়েছে। ওই হার নিয়ে উনি পরে কোনও আলোচনাও করেননি আমাদের সঙ্গে। ২০২৬–এর বিধানসভা নির্বাচনে দলের কাউকে না জানিয়ে পবিত্র করকে দলে যোগদান করানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টিকিট দেওয়া হয়। তার পরিণতিও আমরা দেখেছি। এ ভাবে কোনও দল চলতে পারে না। ওঁর একতরফা সিদ্ধান্তের জন্যই আজ তৃণমূলের এই হাল।’

  • Link to this news (এই সময়)