• দেবীদুর্গার মণ্ডপসজ্জায় এবার বিদেশিনী, বাঙালি শিল্পীর হাত ধরে পুজোয় দেবেন কোন বার্তা?
    প্রতিদিন | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • বছর ছয় আগের কথা। ফিলিপাইনে মৃত তিমির পেট থেকে প্রায় ৪০ কেজি প্লাস্টিক উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় কপালে ভাঁজ পড়ে পরিবেশপ্রেমীদের। সেই ঘটনার কথা মনে দাগ কেটে যায় শিল্পী ধীমান সুতারের। সমুদ্র ও পরিবেশরক্ষার বার্তা কীভাবে শিল্পের মধ্যে দিয়ে জনসমাজে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেকথাই ভাবছিলেন। আর এহেন ভাবনা বহিঃপ্রকাশে দুর্গাপুজোর থেকে উপযুক্ত মঞ্চ আর কী হতে পারে! এবার পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ রূপের সঙ্গে পুরাণের সমুদ্র মন্থনের কাহিনির মিশেলই তাই এবার বালিগঞ্জ ৭১ পল্লির পুজোয় ফুটিয়ে তুলতে চলেছেন ধীমান। তবে চমক শুধু থিমে নয়, চমক হল এই পুজোয় প্রথমবার কাজ করছেন এক বিদেশিনী। বাংলার শিল্পী ধীমান সুতারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন নেদারল্যান্ডের শিল্পী ফেমকে ভ্যান গেমার্টে।

    পুরাণে বলা হয়েছে, দেবতা ও রাক্ষসরা এক সময় সমুদ্র মন্থন করেন। তার ফলে ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা, পাঞ্চজন্য, পারিজাত এবং মা লক্ষ্মীর পর অমৃত উঠে আসে। তখন দেবতারা মনে করেন, আরও মন্থন করলে না জানি কী অমূল্য সম্পদ উঠে আসবে। তাই সমুদ্র মন্থন চালিয়ে যান তাঁরা। কিন্তু সেই পাপের ফলে সমুদ্রগর্ভ থেকে উঠে আসে হলাহল। যার ঝাঁজে গোটা সৃষ্টি ধ্বংসের মুখে চলে যায়। শুকিয়ে যায় গাছপালা, নদীনালা। বিষের কুপ্রভাবে যেন ঝিমিয়ে পড়ে গোটা পৃথিবী। সেই সময় সৃষ্টিকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন মহাদেব। বিষ নিজের কণ্ঠে ধারণ করেন তিনি। তার প্রভাবে সারা শরীর নীল হয়ে যায়। সে কারণেই তাঁর আরেক নাম নীলকণ্ঠ। সেই সময় নিজের বুকের দুধ পান করিয়ে মহাদেবকে তীব্র জ্বালা থেকে রক্ষা করেন পার্বতী। বর্তমানে পৃথিবীরও যেন একই অবস্থা।

    সমানে বাড়ছে পরিবেশ দূষণ। প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্যের যথেচ্ছ ব্যবহারে ধরাধামও প্রায় ধ্বংসের মুখে। মাটিতে মিশছে বিষ। শাকসবজি থেকে ফলমূল – বিষ মিশছে তাতেও। নীল জলের বুক চিরে আজ উঠছে না কোনও সঞ্জীবনী অমৃত। বরং উঠে আসছে সাধারণ মানুষের তৈরি করা বিষাক্ত ‘হলাহল’। জলজ প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান হারাচ্ছে। বন্দি হচ্ছে পলিথিনের অদৃশ্য ফাঁদে। জলের স্বচ্ছ আয়না আজ আবর্জনার আস্তরণে ঢাকা পড়ে হারিয়ে ফেলেছে তার প্রকৃত রূপ। এই ভয়াবহতাকেই ‘দর্পণ’-এর মতো থিম ভাবনায় তুলে ধরা হবে। এই ‘দর্পণ’ অবশ্য কেবল জলদূষণের ভয়াল রূপই তুলে ধরবে না। পুজো থিমের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে আত্মঘাতী অভ্যাসের নির্মম প্রতিচ্ছবি। আরও একবার পরিবেশকে বাঁচানোর শপথ নিতে তাই নিজের মতো করে সমাজকে বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টায় এই পুজো। কিন্তু এই ভাবনার সঙ্গে কীভাবে জড়ালেন বিদেশিনী?

    নেদারল্যান্ডের শিল্পী ফেমকে ভ্যান গেমার্টে বরাবরই বর্জ্য পদার্থ নিয়ে কাজ করেন। সেই সূত্রেই শিল্পী ধীমান সুতারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। যদিও এই প্রথমবার দুর্গাপুজোর কাজ করছেন তিনি। শিল্পী ধীমান সুতার বলেন, “চাইছিলাম মণ্ডপে জলের ঢেউ তৈরি করতে। যা প্লাস্টিক কিংবা অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ দিয়ে হবে। ওই কাজটিই করছেন তরুণী বিদেশিনী শিল্পী।” বাংলার উৎসবে কাজ করতে পেরে আপ্লুত বিদেশিনী। তাঁর কথায়, “কখনও বাংলার দুর্গাপুজো দেখিনি। তবে ধীমানের কাছে উৎসবের অনেক গল্প শুনলাম। ছবি দেখলাম। দারুণ লাগছে গোটা পরিবেশটা। বিশেষ করে দুর্গার অসুর দমনের কাহিনি।” নারীশক্তির আরাধনাই যেন এই কাজে আরও উদ্বুদ্ধ করছে ভ্য়ানকে।

    থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই প্রতিমা গড়ছেন ধীমান। প্রতিমা হচ্ছে ফাইবারের। জলে ভাসমান প্রতিমার মুখাবয়ব একেবারেই সাবেকি বলেই জানান শিল্পী। বলে রাখা ভালো, বাংলার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে আগেই। চলতি বছর বিদেশেও বাংলার পুজোকে ছড়িয়ে দিতে ইনফ্লুয়েন্সরদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা শুভেন্দু সরকারের। আর ঠিক এবারই কলকাতার পুজোয় বিদেশিনীর যোগদান, নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। আগেও ভিনদেশ থেকে শিল্পী এসে পুজোর কাজ করেছেন। তবে পুজোয় কোনও মহিলার যোগ আগে সেভাবে শোনা যায়নি।  এই কাজ দর্শকদেরও মন জয় করবে বলেই আশা উদ্যোক্তাদের।
  • Link to this news (প্রতিদিন)