‘ডাকাতের গ্রাম’ নয়, এবার পরিচয় হবে ‘ডাক্তারের গ্রাম’
আজকাল | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: একসময় সন্ধ্যার পর এই গ্রামের পাশ দিয়ে যেতে ভয় পেতেন মানুষ। পথ চলতি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামের 'দুর্নাম'। সময় বদলেছে, বদলেছে গ্রামের মানুষও। কিন্তু পুরনো সেই তকমা এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। তাই এবার নতুন পরিচয়ে নিজেদের চিনতে চান বাঁকুড়ার ওন্ডা ব্লকের পুলিশোল গ্রামের বাসিন্দারা।
‘ডাকাতের গ্রাম’-এর বদলে তাঁদের স্বপ্ন- একদিন এই গ্রাম পরিচিত হবে ‘ডাক্তারের গ্রাম’ নামে। আর সেই স্বপ্নের শুরু গ্রামেরই এক মেধাবী তরুণ কালিমুল্লাহ মণ্ডলের হাত ধরে।
পুলিশোল গ্রামের মুক্ষ্যাপাড়া এলাকার বাসিন্দা কালিমুল্লাহ মণ্ডল এই প্রথম গ্রামের কোনও ছাত্র হিসেবে নিট পরীক্ষায় সফল হয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর সাফল্যে শুধু পরিবার নয়, উচ্ছ্বসিত গোটা গ্রাম। কালিমুল্লাহর হাত ধরে বহুদিনের বদনাম ঘুচিয়ে গ্রামের নতুন পরিচয় তৈরি হবে- এমনই আশায় বুক বাঁধছেন স্থানীয়রা।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল কালিমুল্লাহর। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি খুব একটা স্বচ্ছল না হলেও পড়াশোনার ক্ষেত্রে কখনও পিছিয়ে যাননি তিনি। নিজের চেষ্টাতেই এগিয়ে গিয়েছেন। বাঁকুড়ার বঙ্গ বিদ্যালয় থেকে ৪৪০ নম্বর পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।
এরপর নিট পরীক্ষার প্রস্তুতিও মূলত অনলাইনের মাধ্যমে চালিয়ে যান। কোনও নামী কোচিং প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ না থাকলেও নিজের অধ্যবসায়েই লক্ষ্যে পৌঁছন কালিমুল্লাহ।
নিট ২০২৬ পরীক্ষায় তাঁর সাফল্য পরিবারে নিয়ে এসেছে বিরাট আনন্দ।
রাজ্যস্তরে তাঁর র্যাঙ্ক প্রায় ৮ হাজার এবং সর্বভারতীয় স্তরেও তিনি উল্লেখযোগ্য ফল করেছেন। সেই সাফল্যের জেরেই গত মঙ্গলবার বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয়েছেন তিনি।
ছেলের এই সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই গর্বিত বাবা-মা। কালিমুল্লাহর বাবা বু আলী মণ্ডল এগ্রি মেকানিক্যাল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। মা মোমিনা মণ্ডল গৃহবধূ। ছেলের সাফল্যের আনন্দ তাঁরা শুধু নিজেদের মধ্যে আটকে রাখেননি, ভাগ করে নিয়েছেন প্রতিবেশী এবং গ্রামবাসীদের সঙ্গেও।
মোমিনা মণ্ডলের কথায়, ছোট থেকেই ছেলে পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী। পরিবারের আর্থিক সমস্যার কথা বুঝে কালিমুল্লাহ কখনও অযথা কোনও আবদার করেননি। নিজের প্রয়োজনও অনেক সময় নিজেই সামলে নিয়েছেন। তাঁর একটাই লক্ষ্য ছিল- পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো। নিটে ছেলে সফল হওয়ায় সেই স্বপ্নের প্রথম ধাপ পূরণ হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
মায়ের স্বপ্ন এখন আরও বড়। তিনি চান, কালিমুল্লাহ শুধু চিকিৎসক হওয়ার পরীক্ষায় সফল না হয়ে একজন ভালো মানুষ এবং 'মানবিক ডাক্তার' হয়ে উঠুন। গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ান। কালিমুল্লাহও জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তাঁর চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্য শুধু নিজের প্রতিষ্ঠা নয়। গ্রামের গরিব-অভাবী মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
পুলিশোল গ্রামের ইতিহাসে কালিমুল্লাহর এই সাফল্য তাই নিছক একজন ছাত্রের সাফল্য নয়। স্থানীয়দের কাছে এটি যেন গ্রামের পরিচয় বদলের প্রথম সিঁড়ি। এর আগে গ্রামের একাধিক বাসিন্দা সরকারি চাকরি পেলেও, এই প্রথম পুলিশোল থেকে কেউ ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেলেন।
ফলে কালিমুল্লাহকে ঘিরে গ্রামে তৈরি হয়েছে নতুন উৎসাহ। তবে নিজের সাফল্যেই থেমে থাকতে চান না কালিমুল্লাহ। ভবিষ্যতে সুবিধাবঞ্চিত এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের নিট পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সাহায্য করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। তাঁর মতে, শুধু অর্থের অভাবে কোনও মেধাবী পড়ুয়ার স্বপ্ন থেমে যাওয়া উচিত নয়। সঠিক দিশা এবং সুযোগ পেলে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রছাত্রীরাও বড় সাফল্য পেতে পারে।
যে গ্রামের নাম একসময় ভয় আর আতঙ্কের সঙ্গে উচ্চারিত হত, সেই গ্রামেরই এক তরুণ এখন হাতে তুলে নিয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই। পুরনো বদনামের জায়গায় নতুন পরিচয়ের স্বপ্ন দেখছেন গ্রামের মানুষ। কালিমুল্লাহর সাফল্য হয়তো সেই পরিবর্তনের সূচনা। ‘ডাকাতের গ্রাম’ নামটি মুছে গিয়ে একদিন সত্যিই পুলিশোল ‘ডাক্তারের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত হবে- এই আশাতেই এখন দিন গুনছেন গ্রামবাসীরা।