• গিলের সেই সেভ, গৌরবের ফিস্ট, দু’বারই বেঁচেছে ইস্টবেঙ্গল, বাবা হারানো লাল-হলুদ গোলকিপার লিখলেন, 'জীবনে এই ভাবেই ফিরে আসতে হয়'
    আজকাল | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফুটবলে গোলকিপারের ভুল চোখে পড়ে সবার আগে। কিন্তু গোলপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির ভিতরে কী চলছে, তা কি কেউ দেখতে পান? ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার গৌরব সাউয়ের ক্ষেত্রেও গল্পটা ঠিক তেমনই।

    বারাসতের বহু চর্চিত কলকাতা লিগের ডার্বির পর গৌরব ছবি পোস্ট করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “জীবনে বারবার এভাবেই ফিরে আসতে হয়।”

    বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কথাটা শুধু ফুটবল নিয়ে। ডার্বিতে পিছিয়ে পড়ে ফিরে এসেছিল ইস্টবেঙ্গল। শেষ মুহূর্তে আঙুলের ছোট্ট টোকায় বল বাইরে পাঠিয়ে ইস্টবেঙ্গলকে বাঁচিয়েছিলেন গৌরব। ধারাভাষ্যকাররা বলছিলেন, ''নিজেকেই গৌরবান্বিত করছেন গৌরব।''

    পিছিয়ে থেকে ম্যাচে ফেরা, গোল করে ঘুরে দাঁড়ানো বা বিষ ঢেলে দেওয়া ফ্লিক ফিস্ট করে বাঁচিয়ে দেওয়ার মধ্যেও তো কোথাও ফিরে আসার গল্পই থাকে। গৌরব নিশ্চয় সেই ফিরে আসার কথা বলেননি। তাঁর কাছে এই ফিরে আসার অর্থ আরও গভীর।

    কয়েক মাস আগেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়কে হারিয়েছেন তিনি। ২৫ ডিসেম্বর, প্রভু যিশুর আবির্ভাবের দিন। পৃথিবীর কাছে যে দিন আলো, আশা আর ভালোবাসার বার্তা নিয়ে আসে, গৌরব সাউয়ের জীবনে সেই দিনটিই হয়ে রইল গভীর অন্ধকারের স্মৃতি।

    দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর চলে যান গৌরবের বাবা। গৌরবের ফুটবলজীবনের প্রথম দর্শক, প্রথম সমর্থক এবং প্রথম শিক্ষকও ছিলেন তাঁর বাবাই।

    সেই কোন ছোটবেলায় গৌরবকে ফুটবল খেলায় হাতেখড়ি দিয়েছিলেন তিনিই। কলকাতা লিগের ম্যাচ দেখতে ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। যেখানে ফুটবল, সুযোগ পেলেই তিনি সেখানে পৌঁছে যেতেন। ফুটবল তাঁর কাছে শুধু খেলা নয়, ভালোবাসা।

    বাবাই চেয়েছিলেন ছেলেকে বড় মঞ্চে দেখতে। কিন্তু সেই ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি।

    গৌরব যখন ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলা শুরু করেছেন, তাঁর বাবা তখন শারীরিকভাবে এতটাই অসুস্থ যে নিয়মিত মাঠে এসে ছেলের খেলা দেখতে পারেননি। এমনকি ডার্বিও নয়। তবু একবার অসুস্থ শরীরেও মাঠে গিয়েছিলেন। গাড়ি করে গিয়ে দেখেছিলেন ছেলের খেলা।

    গৌরবের মনে তখনও একটা ইচ্ছে ছিল, একদিন এমন একটা ডার্বি খেলবেন, যে ডার্বি দেখতে বাবা মাঠে থাকবেন। সেই ইচ্ছে আর পূরণ হল না।

    ইস্টবেঙ্গলে ট্রায়াল দিয়ে গৌরব যখন প্রথম সুযোগ পান, সেদিনই তাঁর জীবনের প্রথম আরএফডিএল ডার্বি। এমনকি তিনি নিজেও জানতেন না যে প্রথম ম্যাচটাই ডার্বি হতে চলেছে। সরাসরি বড় ম্যাচে নেমে পড়েন তিনি। মাঠে নামার আগে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ম্যাচ জিতেই মাঠ ছাড়বেন।

    সেই ডার্বি ইস্টবেঙ্গল জিতেছিল ২-০ গোলে। গৌরব পেনাল্টিও বাঁচিয়েছিলেন।

    খবরের কাগজে ছেলের সাফল্য়ের কাহিনি পড়েছিলেন অশক্ত শরীরের বাবা। গোলপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে ছেলেটা ডার্বির চাপ সামলাচ্ছে, সেই মুহূর্তের সাক্ষী হতে পারেননি। তারপর সময় এগিয়েছে। গৌরবও এগিয়েছেন।

    কিন্তু বাবাকে হারানোর পর সেই এগিয়ে চলাটা সহজ ছিল না। বরং প্রতিটি ম্যাচের আগে ফিরে আসে একই মুখ। মনে পড়ে যায় মানুষটার কথা, যিনি ছোটবেলায় ফুটবল মাঠে নিয়ে যেতেন। যিনি বলেছিলেন, যেখানে খেলবে, যেভাবেই খেলবে, সিরিয়াস থাকতে হবে।

    এই কথাগুলোই এখন গৌরবের কাছে যেন বাবার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার। ডুরান্ড কাপে সিনিয়র দলের হয়ে প্রথম ম্যাচের পর বাবার সঙ্গে ছবি পোস্ট করে লিখেছিলেন, ''এই ম্যাচ তোমাকে উৎসর্গ করলাম বাবা।''
    কলকাতা লিগে ইস্টবেঙ্গল এখনও অপরাজিত। এমনকী মোহনবাগানের তারকাসমৃদ্ধ দলও পারেনি ইস্টবেঙ্গলকে থামাতে।

    প্রথমার্ধে গোল হজম করেছিল ইস্টবেঙ্গল। মনবীর সিংয়ের শটটা থামাতে পারেননি গৌরব। ওই গোল খাওয়ার যন্ত্রণা তাঁকে গ্রাস করেছিল। নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল। বিরতিতে সেই রাগ বেরিয়ে আসছিল। ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপিং কোচ অরিন্দম ঘোষ তাঁকে একটা সহজ কথা বলেছিলেন, ''ম্যাচ এখনও শেষ হয়নি। বাকি দশজনকে বলবি, তুই গোল খাবি না। আর বাকিদের বলবি, গোল করতে হবে।''

    দ্বিতীয়ার্ধে ইস্টবেঙ্গল ফিরল। গোল এল। আর গোলপোস্টের নীচে নিজের কথাটা রাখলেন গৌরব।

    আর দ্বিতীয়ার্ধে এল সেই সেভ। সায়নের টোকা দেওয়া বল যখন বিপজ্জনকভাবে গোলের দিকে যাচ্ছিল, তখন গৌরব ফিস্ট করে তা বাইরে পাঠিয়ে দেন।

    আইএসএলের ডার্বিতে ম্যাকলারেনের পুশটা এমি মার্টিনেজ সুলভ ভঙ্গিতে গিল না থামালে লেসলি ক্লডিয়াস সরণীর ক্লাবে আইএসএল ট্রফি যেত না।

    ঠিক তেমনই সায়নের টোকা ফিস্ট করে বের না করলে ইস্টবেঙ্গলের এই দুর্দান্ত লড়াইয়ের কোনও মূল্যই আজ থাকত না। কোথাও গিয়ে গিলের সেই সেভ আর গৌরবের ফিস্ট একই বন্ধনীতে বসে যায়।

    ট্রাপিজের দড়িতে ব্যালান্স নিয়ে হাঁটেন গোলকিপাররা। ব্যালান্স হারালেই বিপদ। পড়ে যেতে হবে মাটিতে।

    বিপন্ন দলকে জীবন ফিরিয়ে দিলেও বেচারি শেষপ্রহরীর কপালে জোটে না প্রশংসা। উলটে গোল বাঁচাতে না পারলেই ধেয়ে আসে সমালোচনা। বাকি দশ জনের লড়াই ব্যর্থ হয়। উড়ে আসে কটাক্ষ। রক্তাক্ত হন গোলকিপার।

    আসলে গোলকিপাররা চিরকালই একা। একার লড়াই তাঁদের। পেনাল্টি বক্সের ভিতরে গোলকিপার নিঃসঙ্গ রাজা।

    মাঠের গোলকিপার সতীর্থ দশ জনকে আশ্বস্ত করে যান। বলে যান অস্ফুটে, ''তোমরা লড়ে যাও, আমি তো রয়েছি পিছনে।'' ওই বিরাট আশ্বাসবাণী বুকে বল আনে বাকিদের।

    আর জীবনের লড়াইতেও গোলকিপার একাই। একা একাই লড়ে যান বিরুদ্ধ স্রোতের বিরুদ্ধে। বাবা হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে একার লড়াই গৌরবের।

    তাই জীবনে বারবার এভাবেই ফিরে আসতে হয়, এই কথা শুধু একটা ডার্বির গল্প নয়।

    এটা শুধু একজন গোলকিপারের গল্প নয়। এটা এমন এক মানুষের গল্প, যে জীবনের সবচেয়ে গভীর শূন্যতার মধ্যেও নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। বাবাকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা বুকে নিয়েও তিনি আবার গোলপোস্টের নীচে দাঁড়িয়েছেন, প্রতিটি সেভের সঙ্গে যেন নিজেকেই বলে গিয়েছেন, জীবন থেমে থাকে না, ফিরে আসতেই হয়। ফিরে আসার নামই বোধহয় গৌরব।
  • Link to this news (আজকাল)