সময়ের হিসেব ধরা থাকে দিন, মাস, বছরের পাতায়। অথচ সময় পরিবর্তন ঘটে বিশ্বাসে, সম্পর্কে, যাপনে, সমীকরণে। ব্রাত্য বসুর নাটক অবলম্বনে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-তাই নিছক রাজনৈতিক ছবি নয়। বরং সময়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক অদ্ভুত, কখনও মর্মস্পর্শী, কখনও অস্বস্তিকর পাঠ। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচী সেন (ঋত্বিক চক্রবর্তী)। বামপন্থায় বিশ্বাসী এক মানুষ। ২৬ বছর পরে ঘুম ভাঙে তার।
১৯৭৬-এর সময়ের চাদর গায়ে জড়িয়ে ফিরে আসে ২০০২-এ। কিন্তু তার কাছে যে সময় থমকে ছিল, সেই সময়ই তার অনুপস্থিতিতে বদলে দিয়েছে কলকাতাকে, রাজনীতিকে, সমাজকে, এমনকী তার নিজের পরিবারকেও। ফলে ফিরে আসাটা শুধুই ঘরে ফেরা নয়। বরং নিজের বিশ্বাসের সামনে একটি সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া সময়কেও আবিষ্কার করা। এই জায়গাটিকে নিছক অতীত বনাম বর্তমান-এর সংঘাত না বানিয়ে সৃজিত তৈরি করেছেন আরও জটিল অথচ গভীর এক আবহ। একজন মানুষ নিজের সময়েই যেন ক্রমশ বহিরাগত হয়ে পড়ে। ঋত্বিক এই ছবির প্রাণ।
সব্যসাচীর বিস্ময়, অভিমান, অসহায়তা কিংবা পুরোনো বিশ্বাস আঁকড়ে থাকার জেদ, কোনওটাই তিনি বাড়তি অভিনয়ে প্রকাশ করেন না। তাঁর চোখ-মুখের সামান্য পরিবর্তনেই বোঝা যায়, সামনে দাঁড়ানো পৃথিবীটা তাঁর কাছে কতটা অচেনা। সব্যসাচীর কাছে সবচেয়ে বড় বদলটা ঘটেছে নিজের ঘরেই। বামপন্থী বাবার ছেলে ইন্দ্র (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) বদলে যাওয়া সরকারের সমর্থক। দরকার হলে ফের বদলে যেতেও আপত্তি নেই। অথচ সব্যসাচীর কাছে রাজনীতি মানে আদর্শ। আপস শব্দটি তার কাছে অস্তিত্বহীন। ঋত্বিক ও পরমব্রত ছবিটিকে টেনে নিয়ে যান দুই ভিন্ন স্রোতে। দুই প্রজন্ম দুই রাজনৈতিক অভিধানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
এই দ্বন্দ্বের সুন্দর দিকটি হলো, কোনওটাই সম্পূর্ণ সাদা বা কালো নয়। সব্যসাচীর আদর্শবাদ যেমন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, তেমনই ইন্দ্রর বাস্তবতাও একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। তবে দর্শককে ভাবতে হয়—আদর্শ বদলায়, না কি ভিন্ন মতাদর্শ রক্তের সম্পর্কেও ঘুণ ধরায়?
সব্যসাচীর স্ত্রী কম বয়সের রাজলক্ষ্মীর ভূমিকায় সোহিনী সরকার এবং বয়সের ভারে নত রাজলক্ষ্মীর চরিত্রে অনসূয়া মজুমদার। দুই অভিনেত্রীর উপস্থিতি একই মানুষের জীবনের দুই ভিন্ন সময়কে সামনে আনে। রাজেনের ভূমিকায় সত্রাজিৎ সরকার এবং সত্যেনের চরিত্রে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় যথাযথ। সৃজিতের নির্মাণে নাটকের সংলাপ-নির্ভরতা রয়েছে, তবে সিনেমার নিজস্ব দৃশ্যভাষাও আছে। গান ও আবহ এই ছবিতে শুধু অলংকার নয়। কোথাও-কোথাও বক্তব্যের ভার দৃশ্যের স্বাভাবিক প্রবাহকে মন্থর করে। রাজনৈতিক কথনের ঘনত্বও সব দর্শকের জন্য সমান স্বচ্ছন্দের নাও হতে পারে।