গত কয়েক দিন ধরে লাগাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সুর চড়াতে দেখা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। বিধানসভাতেও সেই আঁচ পৌঁছল। আদতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে যে বিল তড়িঘড়ি বৃহস্পতিবার পাশ করানো হয়েছে, তার লক্ষ্যও যে সেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ই, মুখ্যমন্ত্রী নিজের বক্তৃতায় তা স্পষ্ট করে দিলেন।
এই সংশোধনী বিল অনুযায়ী, সরকার চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের প্রয়োজন মতো বদলি করতে পারে। সেই প্রসঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক অধ্যাপকই বামপন্থার জামা গায়ে দিয়ে রয়েছেন। যাঁরা সমাজবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাঁদের আমরা রাজ্যের নবগঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠাব। আপনাদের এই যে এত মেধা, সেটাকে আমরা কাজে লাগাব।’ শুভেন্দুর আরও হুঁশিয়ারি, যাঁরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজ়াদি’, ‘ভারত তেরে টুকরো হোঙ্গে’-র মতো কথা বলেন, তাঁদেরই টুকরো করে দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধী নয়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভাষায় জবাব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার বিধানসভায় ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ় অ্যান্ড কলেজেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ বিল পাশ করিয়েছে রাজ্য সরকার। এই সংশোধনী বিল নিয়ে ইতিমধ্যেই শিক্ষক এবং অভিভাবকদের একাংশ আপত্তি জানিয়েছেন। বিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধিকার ধ্বংস করার পাশাপাশি সেনেট ও সিন্ডিকেটকে অচল করে দিয়ে সরকারি হস্তক্ষেপের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী এই অভিযোগেরও জবাব দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা আইনের চেয়ে বিধানসভা পাশ হওয়া আইনই বেশি প্রাধান্য পায়। ঠিক যে ভাবে আইন নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে বিরোধ বাধলে, কেন্দ্রীয় আইন প্রাধান্য পায়। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘কেউ কেউ বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বাতিল করে নতুন আইন তৈরি করা হয়েছে। নতুন আইনে ইউজিসি-র নির্দেশিকার সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। এই বিষয়ে জানিয়ে রাখি, আইন প্রনয়ণের সম্পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে বিধানসভার। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের বেশি প্রাধান্য পায় সংসদ বা বিধানসভায় পাশ হওয়া আইন।’
মুখ্যমন্ত্রী জানান, কর্নাটক, কেরালা, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বদলি সংক্রান্ত এই নিয়ম চালু রয়েছে। এ বার বাংলাও সেই পথে হাঁটল। সেই সূত্রে আবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি কেন্দ্র-রাজ্যের তরফে ১৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে জানিয়ে শুভেন্দু বলেন, যাঁরা রেড স্যালুট কিষানজি বলেন, গোদাবরী থেকে গোমতি আলাদা ভারত তৈরি করার কথা যাঁরা ভাবেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু-ক্ষুদিরাম বসু-শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাটিতে এ সব আর চলবে না। যাঁরা বলছেন, সকলেই চিহ্নিত। শুধু ছাত্রনামধারীরা নয়, যাঁরা ব্রেনওয়াশ করছেন, তাঁদেরও কড়া ওষুধ দিতে হবে। উপাচার্য গোপাল সেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কমিশন বসাব দরকার হলে। আগের ঘটনা বের করব। জুটার (যাদবপুরে বামপন্থী অধ্যাপকদের সংগঠন) লোকেরা কী কী করেছিলেন, সব ইতিহাস আছে।’ যাঁরা সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করছেন, তাঁদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা ছেড়ে দিন। হোলটাইমার হয়ে যান। গণশক্তি বিক্রি করুন।’
বিলের বিরোধিতা করে তৃণমূল-সহ বিরোধী শিবিরের বিধায়কেরা শিক্ষার গৈরিকীকরণের অভিযোগ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর জবাব, ‘সিপিএমের আমলে শিক্ষার অনিলায়ন হয়েছিল, তৃণমূল আমলে মমতায়ন। আমরা এ সব কোনওটাই করছি না। আপনারা যে শব্দটা বলছেন, ওটা বলা যায় না। আমরা আটটা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্য জায়গায় পড়ানোর সুযোগ দিয়ে বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে শক্তিশালী করতে চাইছি।’
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত বেশ কিছু অভিযোগের খবরের ক্লিপিংও বিধানসভায় দেখিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে বলেছেন, ‘তথাকথিত বামপন্থী জামা গায়ে দিয়ে রাজ্য ও দেশের নির্বাচিত সরকারকে যাঁরা চ্যালেঞ্জ করতেন, দেশ বিরোধী স্লোগান দিতেন, সে সব আর চলবে না। আইনানুগ ব্যবস্থা হবে। একে অপপ্রয়োগ বললে বলুন। যতই কাঁদুন, আমরা আমাদের কাজ করে যাব!’ তাঁর বার্তা, ‘কমিউনিস্টরা শারদোৎসবের জায়গায় যদি দুর্গাপুজো লেখে, একটা স্টলও করতে দেবে না। গরিবের টাকা মেরে আড়াই হাজার পার্টি অফিস। গোটা গুষ্টিকে চাকরি দিয়েছেন। এক-একটা সিপিএম নেতার বাড়িতে ২০টা করে লোক চাকরি করে। সব তালিকা বের করব। শুধু ১৫ বছর নয়, ৩৪ বছর যোগ করে তালিকা বের করব।’