লালকেল্লা নয়, দিল্লির চাঁদনি চকের লালমন্দিরই ছিল জঙ্গিদের মূল নিশানা। কিন্তু প্রবল যানজট এবং এলাকায় পুলিশের উপস্থিতির কারণে সেখানে গাড়ি দাঁড় করাতে পারেনি লালকেল্লা বিস্ফোরণের মূল অভিযুক্ত উমর-উন-নবি। শেষ পর্যন্ত ট্র্যাফিকের জেরে বদলে যায় পরিকল্পনা। লালকেল্লার দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে দেন উমর নবি। সেখানেই ঘটে বিস্ফোরণ। লালকেল্লা বিস্ফোরণকাণ্ডের তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা NIA-র চার্জশিটে।
NIA-র তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর বিস্ফোরক বোঝাই Hyundai i20 নিয়ে চাঁদনি চকে পৌঁছেছিল উমর-উন-নবি। সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিটে লালমন্দিরের কাছে গাড়ি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে সে। কিন্তু ওই সময়ে এলাকায় ছিল ব্যাপক যানজট। পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য পুলিশের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে সেখানে গাড়ি থামিয়ে হামলা চালানো সম্ভব হয়নি বলে দাবি তদন্তে। উমর-উন-নবির গতিবিধি খতিয়ে দেখতে গিয়ে NIA জানতে পারে, বিস্ফোরণের আগে সে যে পথ নিয়েছিল, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ লোকেশন ছিল চাঁদনি চকের লালমন্দির।
CCTV ফুটেজে ধরা পড়েছে, লালমন্দিরের পরিস্থিতি বুঝে উমর গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যায় লালকেল্লার কাছে। সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে লালকেল্লার ৪ নম্বর গেটের কাছে গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটে। অর্থাৎ, মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা হলে লাল মন্দিরেই হতো বিস্ফোরণ।
NIA-র তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরের কাছে গাড়ি রাখার চেষ্টা থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, লালকেল্লাই শুরু থেকে একমাত্র টার্গেট ছিল না। তদন্তকারীদের হাতে থাকা CCTV ফুটেজ অনুযায়ী, লালমন্দিরের কাছে গাড়ি নিয়ে পৌঁছনো এবং লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ১৩ মিনিট। এই ফুটেজই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে।
চাঁদনি চকের অত্যন্ত ব্যস্ত এলাকায় অবস্থিত জৈনদের উপাসনাস্থল লালমন্দির। প্রতিদিন সেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত। তদন্তকারীদের মতে, এই ধরনের জনবহুল ধর্মীয় স্থানকে নিশানা করার পিছনে সর্বাধিক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর পাশাপাশি প্রবল শোরগোল ফেলার লক্ষ্য ছিল জঙ্গিদের।
তদন্তকারীরা উমর-উন-নবির গতিবিধি খতিয়ে দেখে জানতে পেরেছেন, বিস্ফোরণের আগে সে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১২ বার লাল কেল্লায় গিয়েছিল। তার শেষ গিয়েছিলেন বিস্ফোরণের প্রায় ছ’মাস আগে, ২০২৫ সালের ১ মে।
NIA-র তদন্তে শুধু বিস্ফোরণের দিনের ঘটনাই নয়, তার আগে অভিযুক্তদের গতিবিধি এবং সন্ত্রাসী মডিউল পুনর্গঠনের চেষ্টার কথাও উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি, উমর-উন-নবি দীর্ঘ সময় ধরে একটি নিষ্ক্রিয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ককে ফের সক্রিয় করার চেষ্টা করেছিল। সেই নেটওয়ার্কের সঙ্গে Ansar Ghazwat-ul-Hind (AGuH)-এর যোগের কথাও চার্জশিটে রয়েছে।
এমনকী বিস্ফোরক তৈরির পদ্ধতি জানতে অনলাইন মাধ্যম এবং AI টুল ব্যবহার করার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। NIA-র চার্জশিট অনুযায়ী, বোমা তৈরির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে ChatGPT-সহ AI পরিষেবা ব্যবহার করা হয়েছিল। অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও বিস্ফোরক তৈরির সামগ্রী সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণটি ছিল গাড়িবোমা বা Vehicle-Borne Improvised Explosive Device (VBIED)-এর মাধ্যমে হামলা। উমর-উন-নবির ব্যবহৃত গাড়িটিকে বিস্ফোরক বহনের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল বলে NIA-র চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে।
NIA-র চার্জশিটে উমরের বিস্ফোরক তৈরির প্রস্তুতি নিয়েও বেশ কিছু তথ্য রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, বিস্ফোরণের আগের প্রায় ১১ দিন নুহ-তে একটি ভাড়া ঘরে ছিল উমর। সেসময়ে উমর বিস্ফোরক তৈরির জন্য ইউরিয়া ব্যবহারের পদ্ধতি খুঁজেছিল। তার পেনড্রাইভে পাওয়া কিছু PDF-এ ইউরিয়া নাইট্রেট দিয়ে বিস্ফোরক তৈরির পদ্ধতির উল্লেখ ছিল। সেখানে প্রস্রাব থেকে ইউরিয়া সংগ্রহের একটি বিকল্প পদ্ধতির কথাও ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, উমরের ঘর থেকে দুর্গন্ধ বেরোনোয় এক স্থানীয় মহিলা অভিযোগ করেছিলেন। তাঁর দাবি, ঘরের বাইরে একটি পলিব্যাগে প্রস্রাব ভর্তি থাকতে দেখেছিলেন তিনি। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণটি কোনও আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং আগে থেকেই হামলার পরিকল্পনা ছিল।