সুপ্রিম কোর্ট আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। মাথার উপর ঝুলছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, কিন্তু তাঁকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। মত্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। ব্যবসায়ী খুনের মামলায় কাঠগড়ায় ওঠার পরে রাজগঞ্জের বিডিওর পদ থেকে তাঁকে সরানো হয়েছিল। প্রথা অনুযায়ী, কোনও অফিসারকে কোনও পদে বদলি করা হলে, সেই পদে থাকা আগের অফিসার অন্যত্র বদলি হন। রাজগঞ্জের বিডিও হিসেবে ইতিমধ্যেই নিয়োগ করা হয়েছে এক অফিসারকে। কিন্তু এখনও অভিযুক্ত সেই অফিসারকে কোনও পদে বদলির বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি। তিনি কোন পদে রয়েছেন কেউ জানে না, অথচ সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন পেয়ে যাচ্ছেন। স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মামলায় অভিযুক্ত সেই বিডিও প্রশান্ত বর্মনকেই ‘প্রভাবশালী’ তকমা দিল কলকাতা হাইর্কোট। রাজ্যের ভূমিকা নিয়েও কড়া প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুঘে ও বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চের প্রশ্ন, একজন সরকারি অফিসার বেপাত্তা অথচ সরকারি কোষাগার থেকে তাঁকে কী ভাবে মাইনে দেওয়া হচ্ছে? একই সঙ্গে তাঁদের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট বিডিওকে সাসপেন্ড করা হয়েছে নাকি চাকরি থেকেই বরখাস্ত করা হয়েছে? জেলাশাসকই বা এ নিয়ে কী করছেন?
মামলার শুনানিতে রাজ্যের তরফে জানানো হয়, জুলাইয়ে তদন্তভার নিয়েছে সিআইডি। প্রশান্তর খোঁজ চলছে। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে। তবে, এখনও তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। রাজ্যের আইনজীবী আরও জানান, মামলায় একাধিক চার্জশিট দেওয়া হলেও তাতে প্রশান্ত বর্মনের নাম নেই। এ প্রসঙ্গে আদালতের মন্তব্য, ‘এ কেমন অদ্ভুত চার্জশিট!’
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মামলা দায়ের করেছিল। তাদের আইনজীবী অভ্রতোষ মজুমদারের দাবি, বিষয়টি বিরলের মধ্যে বিরলতম। তাঁর অভিযোগ, এফআইআর এবং চার্জশিট সংক্রান্ত অতিরিক্ত হলফনামাতেও অসঙ্গতি রয়েছে। অভিযুক্তের নামই নেই চার্জশিটে। শুনানিতে প্রশান্তর আইনজীবী বিশ্বরূপ ভট্টাচার্য পাল্টা হলফনামা দেওয়ার সুযোগ চান। তখন প্রধান বিচারপতি ঘুঘে স্পষ্ট বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আপনার মক্কেলের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল তো? আপনার মক্কেল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশও লঙ্ঘন করেছেন? তিনি তো খুব প্রভাবশালী ব্যক্তি।’
রাজ্যের বক্তব্য শুনে প্রধান বিচারপতির নির্দেশ, অভিযুক্তকে খোঁজা হোক। তিনি তো দেশ থেকে গায়েব হয়ে যাননি। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীরও প্রশ্ন, একজন পলাতক অভিযুক্ত কী করে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পান? তাঁর কটাক্ষ, ‘আপনাদের প্রশাসন কি এতই দুর্বল যে একজন ঘুরে বেড়াচ্ছেন, হাইকোর্টে মামলা করার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করছেন, আর আপনারা তাঁকে ধরতে পারছেন না।’
আদালত আরও একটি প্রশ্ন তুলেছে—মত্ত অবস্থায় প্রশান্ত বর্মনকে গ্রেপ্তার করে পরে জামিন দেওয়া হয়। তখন পুলিশ কেন জানাল না যে, অন্য কোনও মামলায় তাঁকে প্রয়োজন কি না? এ বিষয়ে রাজ্যকে তথ্য দিয়ে জানানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তিন সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যকে রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ওই সময়ের পরে ফের মামলাটির শুনানি হবে।
দত্তাবাদের স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যাকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় প্রশান্ত বর্মনের নাম জড়ায়। পরিবারের অভিযোগ, ২৮ অক্টোবর ২০২৫ স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপনকে দোকান থেকে কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। পরে স্বপনকে পাওয়া যায় মৃত অবস্থায়। নিম্ন আদালতের দেওয়া তাঁর আগাম জামিন কলকাতা হাইকোর্টে খারিজ হওয়ার পরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় এবং তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশ তিনি সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করলে এ বছর ২৩ জানুয়ারির মধ্যে তাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। সুপ্রিম কোর্টের ওই নির্দেশের পরই রাজগঞ্জের বিডিও পদে পরিবর্তন করা হয়। ২৫ মে গভীর রাতে নিউ টাউনের ইকো পার্ক এলাকায় পথচারীকে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়। পরে মোটর ভেহিকলস আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ঘটনায় তিনি জামিনও পান।