রেস্তোরাঁয় খেতে যাবেন? খাবার মুখে তোলার আগে এই ১০টি জিনিস দেখে নিন
আজ তক | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সামনেই দুর্গাপুজো। পুজো মানেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া। কলকাতার পুজোর সঙ্গে রেস্তোরাঁর খাবারের সম্পর্ক প্রায় অবিচ্ছেদ্য। বিরিয়ানি থেকে কাবাব, রোল থেকে চাইনিজ, মিষ্টি থেকে বেকারি- পুজোর কয়েক দিনে শহরের খাবারের দোকানগুলিতে ভিড় বেড়ে যায়। কিন্তু যে খাবারটি দেখতে এত সুন্দর, সেটি কতটা নিরাপদ? রান্নাঘরের ভিতরে কী হচ্ছে, খাবার কীভাবে রাখা হচ্ছে, কতটা পরিষ্কার পরিবেশে রান্না হচ্ছে- এসব কি আমরা খেয়াল করি? কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানে সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
সম্প্রতি কলকাতা পুরসভা শহরের রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান, বেকারি, ফুড কোর্ট ও বাজারে খাদ্য-নিরাপত্তা অভিযান চালায়। মোট ৫৯২টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৪০টি খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁর খাদ্য লাইসেন্স দুই সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড করা হয়।
পুরসভার পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন রেস্তোরাঁ থেকে পচা ও বাসি খাবার, নষ্ট মাংস, নিম্নমানের মশলা এবং নিষিদ্ধ রং পায়। কিছু প্রতিষ্ঠানে রান্নার তেল বারবার ব্যবহারের বিষয়টিও নজরে আসে। KMC কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যবিধির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল। এই অভিযানে প্রায় ১.৫ টন অর্থাৎ ১,২২৪ কেজি খাবার নষ্ট করা হয়।
রাজ্যজুড়েও নজরদারি
শুধু কলকাতা নয়, রাজ্যজুড়েও খাদ্য-নিরাপত্তা নিয়ে অভিযান হয়েছে। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের পৃথক অভিযানে ৫,৪৩৯টি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও খাবার দোকান পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৪,৭২২টিতে বড় ধরনের অনিয়ম পাওয়া যায়। সন্দেহভাজন ভেজাল ও খাদ্য-নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যার জন্য ২,৭৫৮টি খাবারের নমুনা পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়। ৯৮টি প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রিতে তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা, ৩৫টির লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশন সাসপেন্ড বা বাতিল করা হয়। এছাড়াও ৮০টি দোকান বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সিল করার কথাও ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে। এই তথ্যগুলিই বলে দেয়, পুজোর সময় বাইরে খাওয়ার ক্ষেত্রে একটু বেশি সতর্ক থাকা কেন জরুরি।
রেস্তোরাঁয় গিয়ে কীভাবে বুঝবেন যে সেখানে খাওয়া নিরাপদ?
ঢুকেই পরিবেশটা দেখুন
রেস্তোরাঁয় ঢোকার পর শুধু সাজসজ্জা দেখবেন না। টেবিল, মেঝে, চেয়ার, কাউন্টার- চারপাশটা লক্ষ্য করুন। তেলচিটে মেঝে, জমে থাকা ময়লা, দুর্গন্ধ বা প্রচুর মাছি ঘুরতে দেখা গেলে সতর্ক হওয়া ভালো। সামনের অংশ পরিষ্কার থাকলেও রান্নাঘরের অবস্থা একই রকম হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে দৃশ্যমান জায়গার পরিচ্ছন্নতা সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে।
খাবার ঢাকা রয়েছে কি না দেখুন
কাউন্টার বা বুফেতে রাখা খাবার দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রয়েছে কি না খেয়াল করুন। খাবার ঢেকে রাখা হচ্ছে কি না, গরম খাবার যথাযথ ভাবে গরম রাখা হচ্ছে কি না এবং ঠান্ডা খাবার প্রয়োজনীয় তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না- এসব দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
রান্নাঘর দেখা গেলে নজর দিন
রান্নাঘর দেখা গেলে কর্মীদের পোশাক, কাজের জায়গা, বাসনপত্র এবং খাবার রাখার জায়গা লক্ষ্য করতে পারেন। দেওয়ালে ছত্রাক, জমে থাকা তেল-ময়লা বা খাবার অপরিষ্কার জায়গায় রাখা থাকলে সেটি ভালো লক্ষণ নয়।
খাবারে অস্বাভাবিক গন্ধ পেলে খাবেন না
মাংস, মাছ, ডিম বা অন্য খাবারে পচা, বাসি বা অস্বাভাবিক টক গন্ধ পেলে খাওয়ার ঝুঁকি নেবেন না। খাবারের রং অস্বাভাবিক মনে হলেও সতর্ক হতে পারেন। তবে শুধু রং দেখেই খাবার নিরাপদ বা অনিরাপদ বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
ভাজার তেল কেমন, খেয়াল করুন
ভাজাভুজির খাবারে তেল বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা বাইরে থেকে সবসময় বোঝা যায় না। তবে তেল অতিরিক্ত কালচে, ঘন বা পোড়া গন্ধযুক্ত মনে হলে সতর্ক হওয়া ভালো। KMC-র সাম্প্রতিক অভিযানে কিছু প্রতিষ্ঠানে তেল বারবার ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে- তাই পুজোর সময়ে এই বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
কাঁচা ও রান্না করা খাবার কীভাবে রাখা হচ্ছে দেখুন
কাঁচা মাংস, মাছ বা ডিম এবং রান্না করা খাবার পাশাপাশি খোলা অবস্থায় রাখা হচ্ছে কি না খেয়াল করুন। রান্না করা খাবারের সঙ্গে কাঁচা উপকরণের সরাসরি সংস্পর্শ দূষণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
খাবার পরিবেশনকারীদের পরিচ্ছন্নতা লক্ষ্য করুন
খাবার পরিবেশনকারী কর্মীদের হাত পরিষ্কার কি না, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না- এসবও লক্ষ্য করার মতো বিষয়। রান্না করা খাবার সরাসরি হাতে ধরার মতো অভ্যাস দেখলে সতর্ক হতে পারেন।
প্লেট, গ্লাস ও চামচ দেখে নিন
খাবার আসার আগে প্লেট, গ্লাস ও কাটলারি একবার দেখে নেওয়া ভালো। তেলচিটে দাগ, খাবারের পুরনো অংশ বা দুর্গন্ধ থাকলে নতুন বাসন চাইতে পারেন।
ভিড় মানেই খাবার নিরাপদ নয়
রেস্তোরাঁয় প্রচুর ভিড় বা দীর্ঘ লাইন দেখে খাবারের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। জনপ্রিয়তা আর খাদ্য-নিরাপত্তা এক বিষয় নয়। সাম্প্রতিক KMC অভিযানে জনপ্রিয় কিছু প্রতিষ্ঠানও নজরে এসেছে বলে India Today-র রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
সন্দেহ হলে চুপ থাকবেন না
খাবারে পোকা, ছত্রাক, অস্বাভাবিক গন্ধ বা অন্য কোনও সমস্যা চোখে পড়লে সেটি না খাওয়াই ভালো। প্রথমে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষকে জানান। প্রয়োজন হলে প্রমাণ হিসেবে ছবি রাখতে পারেন এবং সংশ্লিষ্ট খাদ্য-নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো যেতে পারে।
তাই পুজোর ভিড়ে পছন্দের খাবার খেতে গিয়ে তাই শুধু স্বাদ নয়, পরিচ্ছন্নতাকেও গুরুত্ব দিন। কারণ প্লেটে খাবার আসার পর তার স্বাদ বোঝা যায়, কিন্তু খাবারটি কতটা নিরাপদ ছিল- সেটা বোঝার সুযোগ অনেক সময় থাকে না।