দেবীর ভোগে ইলিশ-চিংড়ি, অসুরের ভাগে সুরা, বাংলার এই দুর্গাপুজোয় আজও অটুট রীতি
প্রতিদিন | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুর্গাপুজোয় আমিষ বিতর্ক নিয়ে চলছে জোর বিতর্ক। তবে বাংলার বুকে এমন কিছু দুর্গাপুজো রয়েছে যেখানে বছরের পর বছর ধরে আমিষ ভোগ দেবীকে নিবেদন করা হয়। তার মধ্যে অন্যতম খিদিরপুরের খণ্ডরুই রাজবাড়ির পুজো। এখানে দেবীর ভোগে থাকে ইলিশ ও চিংড়ি মাছ। অসুরকে দেওয়া হয় সুরা। বছরের পর বছর ধরে আজও অটুট ঐতিহ্য।
একসময় গমগম করত রাজবাড়ি। পুজোর ভিড় জমাতেন অগুনতি মানুষ। তবে সেসব পুরনো দিনের কথা। রাজপাট চুকেছে সেই কবে। রাজাও নেই। রেলশহর খড়গপুরের শতাব্দী প্রাচীন এই রাজবাড়ি যেন এখন ‘দুয়োরানি’। জেলার পর্যটন মানচিত্রেও স্থান পায়নি রাজবাড়ি। উদাসীনতার কারণে রাজবাড়ির ঐতিহ্য যেন অতীত হতে বসেছিল। তবে সাধারণ মানুষের তৎপরতায় তৈরি ‘খণ্ডরুই অজয় সিংহ গজেন্দ্র মহাপাত্র চ্যারিটেবল ট্রাস্টে’র তৎপরতায় যেন নবজীবন ফিরে পেয়েছে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া রাজবাড়ি।
ইতিহাস বলছে, দাঁতনের খণ্ডরুই ছিল ওড়িশার রাজাদের করদ রাজ্য। সেখানে তেলেঙ্গি রাজা ছিলেন। তেলেঙ্গি রাজা নাকি একসময় খাজনা দিতে অস্বীকার করেন। সেই সময় ওড়িশার রাজা চৌধুরী কৃষ্ণদাস এক সেনাপতিকে করদরাজ্য পুনরুদ্ধারে পাঠান। তাতে জয়ী হন ওড়িশার রাজা। তেলেঙ্গি রাজা ভাগ্যশ্রী মন্দিরে আত্মগোপন করেন। পরে যদিও তাঁকে খুঁজে বের করে বলি দেওয়া হয়। তখন রানি এসে রাজার কাছে আর্জি জানান, দুর্গাপুজো যেন বন্ধ না হয়। তারপর রানি ঝাঁপ দেন সতীকুণ্ডে। তারপর থেকে পুজো সেই যুগে কখনও বন্ধ হয়নি। যদিও রাজপাটের অবসানের পর প্রায় ১৩ বছর দুর্গাপুজো বন্ধ ছিল।
‘খণ্ডরুই অজয় সিংহ গজেন্দ্র মহাপাত্র চ্যারিটেবল ট্রাস্টে’র তৎপরতায় পুজো শুরু হয়। এখানে পুজো শুরু হয় মহালয়ায়। দেবীর পুজোর ভোগই যেন এখানকার বিশেষত্ব। প্রতিদিন সকালে দেবীকে লুচি, সুজি, পায়েসের মতো নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। রাতে দেওয়া হয় আমিষ ভোগ। নবমীতে ইলিশ ও চিংড়ি মাছ দেওয়া হয়। সঙ্গে রুই, কাতলা তো রয়েছেই। অসুরের জন্য সুরার ব্যবস্থা থাকে। তা আবার তৈরি হয় বিশেষ পদ্ধতিতে। পশুবলি এখানে হয় না। বদলে চালকুমড়ো, আখ বলি হয়। একসময় পুজোর সময় যাত্রাপালা হত। এখন অবশ্য তা আর হয় না। রামায়ণ এবং বাউল গানের আয়োজন করা হয়। পুজোর কটাদিন এই পুজোকে কেন্দ্র করেই যেন হইহই করে বাঁচেন স্থানীয়রা। সারাবছরের ব্যস্তময় জীবনে যেন একটুকরো প্রাণ খুলে বাঁচার রসদ এই পুজোর অপেক্ষায় আপাতত দিন গুনছেন এলাকার মানুষজন।