এই সময়: যাদবপুরে যে অধ্যাপকরা ছাত্রদের মগজধোলাই করে সনাতনীদের টার্গেট করছেন তাঁদের কড়া ওষুধ দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়স্তরে শিক্ষক–শিক্ষাকর্মীদের বদলির আইন করা হচ্ছে বলে বিধানসভায় জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই আইন যাঁদের পছন্দ হবে না, তাঁরা চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন বলেও সোজাসাপটা জানিয়েছেন শুভেন্দু।
রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার চার মাসের মাথায় ক্যাম্পাস থেকে বামপন্থার বীজ উপড়ে ফেলার এটাই উপযুক্ত সময় বলে মুখ্যমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ। সে কারণেই বৃহস্পতিবার বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডেকে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল–২০২৬’ পাশ করানো হয়েছে বলে সরকারের বক্তব্য। এই বিলে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়–সহ ৮টি প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক, শিক্ষাকর্মীদের বদলির বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এর ফলে নতুন তৈরি হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের গুণমান বৃদ্ধি ছাড়াও পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ‘আবর্জনা’ রয়েছে তা সাফ করা যাবে বলেও রাজ্য সরকারের বক্তব্য। এ দিন সংশোধনী বিলের জবাবি ভাষণ রীতি মেনে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় দিলেও বিলের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। তিনি বলেন, ‘সিপিএমের সদস্য এবং তাঁদের সহযোগী আইএসএফ গন্ধ বুঝতে পেরেছে––এই বিল কোথায় আঘাত করবে।... হস্টেল থেকে ছাত্র–ছাত্রীদের জোর করে বের করে নিয়ে যাবেন, বলবেন, ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’, ‘ভারত তেরি টুকরে হোঙ্গে’–– আমরা–ই টুকরো করে দেবো আপনাদের।...রেড স্যালুট কমরেড কিষেণজি? এগুলো যাঁরা বলছেন তাঁরা চিহ্নিত। ব্রেনওয়াশ যাঁরা করছেন, তাঁদেরও কড়া মাপের ওষুধ দিতে হবে।’
আইনে সংশোধনী এনে যাদবপুর–সহ ৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিক্ষাকর্মীদের দার্জিলিং হিল ইউনিভার্সিটি, কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়, ঝাড়গ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নতুন জায়গায় বদলির বন্দোবস্ত করা হলেও পাইকারি হারে তা যে করা হবে না, সেই আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু বলেন, ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একশ্রেণির, মুষ্টিমেয় (অধ্যাপক) তথাকথিত বামপন্থী জামা গায়ে লাগিয়ে, দেশ বিরোধী শক্তি, শিক্ষা বিরোধী শক্তিকে (মদত দিচ্ছে), সাংবিধানিক ভাবে নির্বাচিত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে চ্যালেঞ্জ করছেন। এক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনার প্রশ্নে নতুন আইন প্রয়োজন ছিল।...দেশবিরোধী কোনও শব্দ, ভারতীয় সংস্কৃতি বিরোধী আস্থায় আঘাত লাগে এমন শব্দ যদি কেউ প্রয়োগ করেন, তা হলে ফরাক্কার এসডিপিওকে যেমন পানিশমেন্ট ট্রান্সফার করা হয়েছে–– সে ভাবে এই আইনের ব্যবহার করা হবে।’
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকদের একাংশ ছাত্রদের মগজধোলাই করা ছাড়াও তাঁদের সংগঠন অশুভ কাজের সঙ্গে জড়িত বলে মুখ্যমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ। এই খতিয়ানও তাঁর কাছে রয়েছে বলে একগুচ্ছ কাগজ দেখিয়েছেন শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘উপাচার্য গোপাল সেনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। প্রয়োজনে কমিশন বসাব। আগের ঘটনা সব বের করব। আমি নিয়ে এসেছি সব। কবে কী করেছিলেন আপনারা? এই জুটা নামধারী লোকেরা কী করেছিলেন–– সব ইতিহাস আছে।’ একই সঙ্গে যাদবপুরে ডিন নির্বাচন নিয়ে কোন কোন অধ্যাপক অতীতে গাজোয়ারি করেছেন, যাদবপুরে অ্যাডমিশন সংক্রান্ত একটি চক্র রয়েছে, এমনকী কিডনি পাচার কেলেঙ্কারির সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের ফ্যাকাল্টির নাম জড়িয়েছে বলেও মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ। এই অবস্থার বদল করতে সংশোধনী বিল নিয়ে অধ্যাপক কিংবা শিক্ষাকর্মীদের আপত্তি থাকা উচিত নয় বলে তিনি মনে করছেন।
এই আইনে যদি কারও আপত্তি থাকে সেই অধ্যাপক কিংবা শিক্ষাকর্মীকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘যাঁদের অসুবিধা হবে তাঁরা ছেড়ে দিন। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ ঝুলিয়ে নিন। হোল টাইমার হয়ে যান। গণশক্তি বিক্রি করুন। দুনিয়ার মজদুর এক হও––বলুন। মাঝে মাঝে ধর্মতলায়, নিউমার্কেটে কৌটো নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।’
সিপিএম–সহ বামদলগুলির ট্র্যাডিশন হলো কৌটো, লাল–শালু নিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা। বাম মনোভাবাপন্ন অধ্যাপকদের শুভেন্দু নিশানা করায় সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তথা যাদবপুরের প্রাক্তনী সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘আপনার কথায় মাস্টারমশাইরা সবাই নতজানু হবেন না। লেখাপড়ার খোঁজখবর না রাখলে উনি যাদবপুরকে বুঝবেন কী করে? মমতা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছেন। বাকি যেটুকু রয়েছে উনি ধ্বংস করতে নেমেছেন।’ শুভেন্দু অবশ্য মনে করছেন এই সংশোধনী বিলে বদলির বন্দোবস্ত নিয়ে অধ্যাপক–শিক্ষাকর্মীদের আপত্তি না তোলাই উচিত। তাঁর ব্যাখ্যা, ‘তথাকথিত পণ্ডিত বলে যাঁরা নিজেদের ঘোষণা করেছেন, আমরা এই বিলকে প্রয়োগ করে তাঁদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাব। আপনাদের এত জ্ঞান, এত আন্তর্জাতিক বুদ্ধি, কমরেড লেনিন, কমরেড মার্কস, চে গেভারা, সমাজতন্ত্র, কৃষক শ্রমিকের রাজত্ব হোক, সকলের সমান রোজগার চাই বলেন... সমাজবাদের কথা বলেন। আমরা এত বিরাট মেধাকে কাজে লাগাতে চাই। আপত্তির কী আছে? আপত্তি থাকার দরকার নেই।’ শিক্ষাকর্মীদের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, ‘যে শিক্ষাকর্মীরা রয়েছেন তাঁদের হাতে প্রচুর সময়––এরা (স্লোগান দেন) লাল ঝান্ডা করে পুকার, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। তাঁরা যেখানে শিক্ষাকর্মী নেই, সেখানে ভালো করে ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি তৈরি করুন।’ বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী তৃণমূল এই বিল নিয়ে কিছু প্রশ্ন করলেও ভোটাভুটির আগে অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াক–আউট করে। ১৭১ বনাম ১৫ ভোটে বিল পাশ হয়ে যায়। কালীঘাট তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেস, আইএসএফ বিলের বিরোধিতা করে ভোট দিয়েছে।
ওয়াকআউট করলেও বিলের উপরে বিতর্কে ঋতব্রত প্রশ্ন তোলেন, ‘রাজ্য সরকারের সঙ্গে যাঁরা সহমত পোষণ করেন না তাঁদের বাছাই করে টার্গেট করা হবে না তো? তবে কিছু জায়গায় মৌরসিপাট্টা রয়েছে তা ভাঙা প্রয়োজন।’ এই বিল নিয়ে বিধানসভার প্রেস কর্নারে কালীঘাট তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, ‘সরকারপক্ষের বক্তারা অধ্যাপকদের সরাসরি হুমকি দিলেন। এই বিল অপছন্দের লোককে বদলি করার বিল। এটা দমনপীড়নের বিল।’