এই সময়, নয়াদিল্লি ও কলকাতা: তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কখন যাচ্ছেন, কোথায় থাকছেন— এ সব কিছুর উপরেই গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে সাদা পোশাকে নজর রাখছিলেন গোয়েন্দারা। রীতিমতো সিনেমার কায়দায় পটুয়াপাড়ার মৃৎশিল্পী থেকে শুরু করে গাড়ির ড্রাইভারের বেশে ২৪ ঘণ্টা চলছিল নজরদারি। অপেক্ষা ছিল শুধু আদালতের নির্দেশের। বৃহস্পতিবার বারবেলায় সুপ্রিম কোর্ট তাঁর রক্ষাকবচ তোলার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ১২১ নম্বর কালীঘাট রোডের ঠিকানা থেকে সুমিত রায়কে গ্রেপ্তার করল সিআইডি। এটা অবশ্য সুমিতের বাড়ি নয়। এটা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠিকানা। যে বাড়িতে গত ১৩ জুন সুমিতের খোঁজেই হানা দিয়েছিল পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানার পুলিশ। পরে এই ঘটনার তদন্তভার হাতে নেয় রাজ্য সিআইডি। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে এই মামলায় অভিষেকের পিএ সুমিত সিআইডির নোটিস পেয়ে অন্তত এক ডজন বার হাজিরা দেন। কিন্তু আইনি রক্ষাকবচ থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। এ দিন শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ তাঁর রক্ষাকবচ খারিজ করতেই গ্রেপ্তার করা হয় সুমিতকে।
এ দিন সুমিতকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন বিধানসভায় একদিনের বিশেষ অধিবেশন চলছিল। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘১২১ নম্বর কালীঘাট রোড থেকে একজন বিখ্যাত তোলাবাজ সুমিত রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আবার তোলাবাজ ভাইপোর মেন কালেক্টর ছিলেন।’ যদিও কালীঘাট–তৃণমূলের মুখপাত্র, বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষের প্রতিক্রিয়া, ‘সুমিত রায়ের গ্রেপ্তারি নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না। গোটা কেস সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা নেই, দল থেকেও কোনও নির্দেশ নেই। তাই মন্তব্য করছি না।’ যদিও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, সেটা শুনেছি। এমন কী ঘটনা ঘটল, যে বিধানসভায় একজনের নাম বলতে হচ্ছে? বিধানসভার সদস্য যাঁরা নন, তাঁদের উদ্দেশ করে কেন বলা হচ্ছে? ওঁর সংলাপ থেকেই স্পষ্ট, একটা গ্রেপ্তারে মুখ্যমন্ত্রী কতটা তৃপ্তি পেয়েছেন।’
সুমিতের গ্রেপ্তারির পর্বও ছিল রীতিমতো নাটকীয়। কারণ, তাঁর রক্ষাকবচ খারিজ হলেও সুমিতের সন্ধানে তাঁর বাড়িতে যায়নি সিআইডি। সরাসরি তারা চলে যায় অভিষেকের বাড়িতে। দ্রুত ওই বাড়ির আশপাশ ঘিরে ফেলা হয়। বাড়ির মূল গেটের বাইরে সিআইডি, রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের অফিসার এবং কালীঘাট থানার পুলিশ তখন দাঁড়িয়ে। ছিলেন মহিলা অফিসাররাও। একজন অফিসারকে আবার বাড়ির পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকে পড়তেও দেখা যায়। আবার একজন অফিসারকে গেটে ধাক্কা দিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘ভিতরে কে আছেন? আমরা সিআইডি-পুলিশ থেকে এসেছি। ভিতরে কে আছেন জানান।’ ভিতর থেকে গেট খুলে দেওয়া হলে সিআইডি আধিকারিকরা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির ভিতরে ঢোকেন। সেখানে নিরাপত্তারক্ষীদের একটা সময়ে দেখা যায়, বারান্দার গ্রিলে পিচবোর্ড জাতীয় কিছু দিয়ে ঢেকে দিতে, যাতে বাইরে থেকে কিছু দেখা না–যায়। যদিও এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিতর থেকে সুমিতকে বের করে এনে গাড়িতে তুলে ভবানীভবনে নিয়ে যান সিআইডি অফিসাররা। সূত্রের দাবি, তাঁর মেডিক্যাল পরীক্ষা করিয়ে আজ, শুক্রবার সুমিতকে মেদিনীপুর কোর্টে তোলা হতে পারে। ঘটনাচক্রে শালবনি থানার জমি দুর্নীতি মামলায় গত জুনে পশ্চিম মেদিনীপুরে তৃণমূলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি সুজয় হাজরাকে গ্রেপ্তার করার পরেই সুমিতের নাম উঠে আসে। তাঁর খোঁজে মোবাইলের টাওয়ার লোকেশনের সূত্র ধরে ১৩ জুন রাতে অভিষেকের বাড়িতে পৌঁছে যায় পুলিশ। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই তদন্তকারীরা স্থানীয় পুলিশের সাহায্য নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েন। দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি চললেও অবশ্য সে দিন সুমিতের খোঁজ মেলেনি। হাইকোর্টের রক্ষাকবচ পেতেই অবশেষে প্রকাশ্যে আসেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টে গত কয়েকটি শুনানিতে রাজ্যের তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা অভিযোগ করছিলেন, রাজ্য পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সহযোগিতা করছেন না শানবনির জমি প্রতারণা এবং ডেবরায় নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত সুমিত রায়৷ বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন৷ এমনকী রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরেও জালিয়াতির বিপুল অঙ্কের নগদ টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে জমা দিয়েছেন তিনি৷ তাই তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করা প্রয়োজন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, সিল বন্ধ খামে সলিসিটর জেনারেলের পেশ করা তদন্ত রিপোর্ট দেখার পরে আদালত সুমিতের আগাম জামিনের আর্জিতে সাড়া দিচ্ছে না৷ বিচারপতি বাগচীও বলেন, ‘এতদিন যথেষ্ট ছাড় দিয়েছি।’
সুমিতের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন অবশ্য এ দিনও সওয়াল করেন, ‘যদি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়, তা হলে রাজনৈতিক দলকে জেরা করা উচিত। সুমিত রায় গোটা সিস্টেমের একটা ক্ষুদ্র অংশ। পুরো মামলাটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, আর তদন্তে দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার নাম বলানোর চেষ্টা চলছে।’ যদিও এই যুক্তি গ্রহণ করেনি শীর্ষ আদালত৷ এই গ্রেপ্তারি নিয়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের প্রতিক্রিয়া, ‘সুপ্রিম কোর্টে আগাম জামিন নাকচ হওয়ার পরে সুমিত রায় গ্রেপ্তার হবেন, এটাই স্বাভাবিক ছিল। নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে সবে তো কান এসেছে। এ বার মাথাও আসবে। মাথা তো ক্যামাক স্ট্রিটে বসে আছে।’