• বিহারের ভুয়ো সার্টিফিকেটে বাংলায় ডাক্তারির রেজিস্ট্রেশন!
    এই সময় | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: বছর চারেকের শিশু অরণ্য রায়ের পুরুষাঙ্গের সামনের আবরণ জুড়ে থাকছিল। দরকার ছিল অস্ত্রোপচারের। গত ২ সেপ্টেম্বর সামান্য সেই ‘ফাইমোসিস’ অপারেশন করতে গিয়েই মৃত্যু হয় ওই বালকের। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ দায়ের হয়েছিল পুলিশেও। এখন অবশ্য বিষয়টি আর থেমে নেই নিছক গাফিলতির অভিযোগে। পূর্ব বর্ধমানের তালিতের সেই অভিযুক্ত ‘জেনারেল সার্জেন’ শেখ সায়দুল হক আদৌ পাশ করা চিকিৎসক নন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠল এ বার। একেবারে তথ্যপ্রমাণ-সহ।

    শুধু সায়দুলই নন, একই অভিযোগ উঠেছে উত্তর ২৪ পরগনার জ়ুলফিকার মণ্ডলের বিরুদ্ধেও। অভিযোগ, আদতে কোনও দিন তাঁরা চৌকাঠই মাড়াননি মেডিক্যাল কলেজের। দু’জনই বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভুয়ো শংসাপত্র দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়ে ডাক্তারির লাইসেন্স বাগিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। পূর্ব বর্ধমানের প্রায় ২৫-২৬টি নার্সিংহোমে সায়দুল নিয়মিত অস্ত্রোপচার করেন। আর জ়ুলফিকার উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে নার্সিংহোম চালান এবং ডার্মা ক্লিনিক চালান কলকাতার উপকণ্ঠ নিউ টাউনে। একই সঙ্গে গাইনি ও ডার্মা প্র্যাকটিস তিনি কী ভাবে করেন, তা নিয়েও বিস্মিত চিকিৎসকরা! অভিযোগ, দু’জনই স্বাস্থ্যসাথীর দৌলতে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

    নবগঠিত সংগঠনে যাতে বেনোজল ঢুকে না পড়ে, সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলায় কমিটি তৈরি করতে গিয়ে এই দুই কীর্তিমানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি প্রভূত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছে ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোম’ (এপিএইচএন)। সেই সব তথ্যপ্রমাণ স্বাস্থ্য দপ্তর ও রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে জমা দিয়ে তৃণমূল জমানায় কাউন্সিলের মাথায় থাকা কর্তাদের অপসারণ ও সাসপেনশন দাবি করেছে সংগঠন। কারণ, তারা মনে করছে, কাউন্সিলের গাফিলতিতেই শেখ সায়দুল হক (রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৮০১৯৮) ২০১৮-তে এবং জ়ুলফিকার মণ্ডল (৮৯০২১) ২০২২-এ রেজিস্ট্রেশন পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে। ওই দুই ভুয়ো ডাক্তারের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপের প্রস্তুতি শুরু করেছে দুই জেলার স্বাস্থ্য প্রশাসনও।

    অভিযোগকারী এপিএইচএন–এর সম্পাদক চিকিৎসক রাজীব পাণ্ডে বলেন, ‘তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলে রেজিস্ট্রেশনের আবেদন করতে গিয়ে ওই দু’জনই বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের ২০০৭-এর অভিন্ন রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৩৬৪৪২ ব্যবহার করেছেন! আদতে ওই নম্বরটি বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার সহজানন্দ প্রসাদ সিংয়ের চিকিৎসক পুত্রবধূ বন্দনা শর্মার।’ রাজীব বিস্মিত, কী ভাবে এ রকম ভুয়ো নথি যাচাই না করেই দু’জনকে পাকাপাকি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিল পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল! তাঁর সন্দেহ, এই অনিয়ম নিছক অসাবধানতা নয়, বরং ইচ্ছাকৃতই। আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

    এক স্বাস্থ্য আধিকারিক বলেন, ‘পুরোটা তদন্তের মধ্যে রয়েছে। আর্থিক লেনদেনের বিষয়েও তদন্ত হচ্ছে।’ স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, এপিএইচএন যখন সায়দুল ও জ়ুলফিকারের বিহারের রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে যোগাযোগ করে বিহার কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রেজিস্ট্রশন দপ্তরে, তখন তারা সাফ জানিয়ে দেয়, সায়দুল ও জ়ুলফিকারের পেশ করা রেজিস্ট্রেশ সার্টফিকেট সম্পূর্ণ জাল। এ নিয়ে এপিএইচএন-কে জবাবি ই-মেল করার পাশাপাশি বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে অভিযোগ জানিয়ে ই-মেল করা হয় পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলেও।

    পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় বলেন, ‘অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।’ যদিও এপিএইচএন মনে করে, যাঁর আমলে এই দুর্নীতি, তাঁকে পদে রেখে এই তদন্ত চালানো অর্থহীন। একই সুর কাউন্সিলে রাজ্য সরকারের সদ্য মনোনীত সদস্য মৃণ্ময় অধিকারীর। তিনি বলেন, ‘ফেক ডাক্তার নিয়ে যে খবর পাচ্ছি, সেটা একটা ভয়ঙ্কর দুর্নীতির পরিণাম। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রাণ নিয়ে যে ছেলেখেলা হয়েছে, তার নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার। যাঁরা মেডিক্যাল কাউন্সিলের পদে বসে আছেন, তাঁদের সরিয়েই তদন্ত করা উচিত।’

    সায়দুলকে বৃহস্পতিবার পূর্ব বর্ধমানের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কার্যালয়ে তলব করে যাবতীয় নথি জমা নেওয়া হয় তদন্তের জন্যে। যদিও তাঁর সঙ্গে এর পরে আর যোগাযোগ করা যায়নি। ফোন তোলেননি, মেসেজেরও জবাব দেননি। অন্য দিকে, জ়ুলফিকারের নাগালই পায়নি জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন। তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে বিন্দুমাত্র বিচলিত না–হয়ে বলেন, ‘আমার সব নথি খতিয়ে দেখেই পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে। কোনও গন্ডগোল থাকলে, সে দায় আমার নয়, কাউন্সিলেরই।’

  • Link to this news (এই সময়)