বুদ্ধদেব বেরা, বেলপাহাড়ি
ছবির মতো গ্রাম। মাটির বাড়ি, খড়ের চাল, মেঠো পথ। দেওয়ালে আঁকা লোকচিত্র। প্রকৃতির টানে ও আদিবাসীদের সহজ–সরল জীবনযাত্রা দেখতে প্রত্যেক বছর পর্যটকদের ঢল নামে ঝাড়গ্রামে। শীতের সময়ে হোটেল, লজে বুকিং পাওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। এ বার পর্যটকদের জন্য আরও বড় চমক আসতে চলেছে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়িতে। তৈরি হচ্ছে ‘মডেল গ্রাম’। যা মনে করিয়ে দিতে পারে মেঘালয়ের ‘মাওলিলঙ’কে। পরিচ্ছন্নতার কারণে এশিয়ার মধ্যে মডেল ভিলেজের শিরোপা পেয়েছে যে গ্রাম। আদিবাসীদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে পর্যটকদের ধারণা দিতে এই মডেল ভিলেজ তৈরি করা হবে বলে জানিয়েছে বন দপ্তর। এর জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ১১ কোটি টাকাও বরাদ্দ করেছে।
বন দপ্তর জানিয়েছে, পর্যটন শিল্পকে চাঙ্গা করতে এই পরিকল্পনা করেছে ঝাড়গ্রাম জেলা প্রশাসন। বেলপাহাড়ির বুকে শিমুলপাল অঞ্চলের বালিচুয়ার পাহাড়ের উপরে তৈরি হবে এই গ্রাম। পাহাড়ের উপরে দুই হেক্টর জায়গায় ১৫টি ছোট ছোট মাটির বাড়ি তৈরি করে আদিবাসী গ্রামের পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। পাথরের মেঝে, মাটির দেওয়াল ও কাঠের ছাদ দিয়ে ঘরগুলি তৈরি করা হবে। যেখানে প্রতিটি মাটির ঘরের দেওয়ালে আদিবাসী গ্রামের মতো পশু-পাখি–সহ বিভিন্ন ছবি আঁকা থাকবে। আটটি ঘরে আদিবাসীদের ইতিহাস এবং জীবনযাত্রার মিউজিয়াম গড়ে তোলা হবে। বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসীদের রান্নার স্বাদ নেওয়ারও সুযোগ থাকবে সেখানে। কুরকুটের চাটনি থেকে কুরকুটের ডিমের ওমলেট, শালপোড়া চিকেন, বাম্বু চিকেন, মাংস পিঠের সঙ্গে মেনুতে থাকবে পান্তাভাতও। বেড়ানো আর পেটপুজোর পরে আদিবাসী শিল্পীদের তৈরি বাবুই ঘাস, সাবাই ঘাস, পাথরের নানা সামগ্রী কেনার জন্য বিপণন কেন্দ্রও থাকবে সেখানে। পর্যটকদের জন্য থাকবে ছবি তোলার বিশেষ সুযোগ। দার্জিলিংয়ে যেমন পাহাড়ি পোশাক পরে পর্যটকরা ছবি তোলেন। বেলপাহাড়ির এই মডেল গ্রামেও পাঞ্চি শাড়ি এবং গান্দো ধুতি পরে আদিবাসীদের সাজে ছবি তুলতে পারবেন উৎসাহী পর্যটক। আবার চাইলে পর্যটকরা এই গ্রামে রাতও কাটাতে পারবেন। পর্যটকদের থাকার জন্য ছ’টি ঘরও থাকবে এখানে। মডেল ভিলেজের মাঝে মঞ্চ করে আদিবাসী শিল্পীদের নাচ–গানেরও আয়োজন থাকবে বলে জানিয়েছে বন দপ্তর।
এই মডেল গ্রাম তৈরির ক্ষেত্রে সবকিছুই পরিবেশ বান্ধব থাকবে বলে জানানো হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বৃষ্টির জল ধরে রেখে তা ব্যবহারযোগ্য করার ব্যবস্থা থাকবে। বন দপ্তর জানিয়েছে, ইতিমধ্যে এর জন্য ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বালিচুয়ার পাহাড়ে এই গ্রামটিতে পর্যটকরা যাতে সহজে পৌঁছাতে পারেন তার জন্য পাথরের সিঁড়ি তৈরি করা হবে। শুধু খাওয়া–দাওয়া, দিনযাপন নয়, এই আদর্শ গ্রাম ঘুরে পাহাড়ের নীচে নেমে আসার পরে পুকুরে মাছ ধরতে পারবেন পর্যটকরা। তার জন্য একটি পুকুরও কাটা হবে পাহাড়ের পাদদেশে। এ ছাড়া খেলাধুলোর জন্য থাকবে একটি আর্চারি জ়োন। পর্যটকেরা সেখানে তিরন্দাজি করতে পারবেন। পুরো প্যাকেজের জন্য নির্দিষ্ট দামের টিকিট থাকবে বলে জানিয়েছে বন দপ্তর। সেই টাকা দিয়েই এই আদর্শ গ্রামের রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্বীকৃত ঝাড়গ্রাম ট্যুরিজ়মের কর্ণধার সুমিত দত্ত বলেন, ‘আদর্শ গ্রাম পর্যটকদের কাছে ঝাড়গ্রামের আকর্ষণ নিঃসন্দেহে আরও বাড়িয়ে দেবে। এক ছাতার তলায় অনেক কিছুই পাওয়া যাবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পর্যটকের ঢল নামবে বেলপাহাড়িতে।’ বিনপুরের বিধায়ক প্রণত টুডু বলেন, ‘এখানে ভারী শিল্প নেই। কিন্তু মানুষের কর্মসংস্থান দরকার। তাই আমরা পর্যটনের উপরেই জোর দিচ্ছি। এই গ্রাম গড়ে উঠলে পর্যটকের ভিড় বাড়বে। স্থানীয় মানুষের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।’