• সনাতনী দুর্গায় শিকড়ে ফেরা এই শরতে
    এই সময় | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়, রায়গঞ্জ: কখনও তিনি কৃষক ঘরনি। কখনও বা পরিযায়ী শ্রমিক রমণী। বাঙালি তাঁকে আবিষ্কার করেছে অন্নদাত্রী হিসেবে। তিনিই আবার হয়ে উঠেছেন ঘরের মেয়ে।

    এমন নানা রূপে মহিষাসুরমর্দিনীকে ভেঙেচুরে নিয়েছে বঙ্গজীবনের পরম উৎসব। হাতে গোনা বারোয়ারি কিংবা বনেদি ঠাকুরদালানে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল দশভুজার সাবেকি রূপ। দুর্গার বন্দনায় থিম হয়ে উঠেছিল মুখ্য। মণ্ডপ থেকে প্রতিমার সেই থিম-সজ্জা থেকে কি আবার সাবেকিয়ানার পথে ফিরে যাচ্ছে বাঙালি? তেমনই ইঙ্গিত মিলছে রায়গঞ্জের কুমোরটুলিতে।

    থিমের প্রতিমা নয়, এ বার উত্তর দিনাজপুরের সদর শহরে মৃৎশিল্পীদের কাছে বেশি এসেছে সাবেকি দুর্গার বায়না। বিশেষ করে ডাকের সাজের প্রতিমার চাহিদাই বেশি। বিগত বছরগুলিতে পুজো উদ্যোক্তারা প্রতিমায় নতুনত্ব, আধুনিকতা কিংবা অভিনবত্বের ছোঁয়া চাইতেন। এ বার সেই প্রবণতায় খানিকটা ভাটা। শহরের বড় বাজেটের পুজোগুলির অধিকাংশ বেছে নিচ্ছে সাবেকি ধাঁচের প্রতিমা।

    সিংহ, অসুর, চার পুত্র-কন্যার সঙ্গে এক ফ্রেমে দশ হাতের দেবী, এমন ভিনটেজ লুক হারিয়েই গিয়েছে বারোয়ারি মণ্ডপে। এ বার সেই চেনা রূপ বেশ কিছুটা ফিরে আসার সম্ভাবনা। এটা টের পাওয়া যাচ্ছে কুমোরপাড়ায় উঁকি দিলেই।

    রায়গঞ্জের পরিচিত মৃৎশিল্পী ভানু পাল প্রতি বছর প্রায় ১৭-১৮টি দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করেন। তাঁর তৈরি প্রতিমার মধ্যে থাকে শহরের বেশ কিছু বিগ বাজেটের পুজোও। গত কয়েক বছরে নানা ধরনের থিমের প্রতিমা তৈরি করেছেন তিনি। এ বার তাঁর কাছে এসেছে প্রায় ১৪-১৫টি প্রতিমার অর্ডার। আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি পুজো কমিটিই চেয়েছে সাবেকি প্রতিমা।

    ভানু বলেন, ‘প্রতি বছরই পুজো কমিটিগুলি কোনও না কোনও থিম অথবা প্রতিমায় নতুনত্ব, আধুনিকতা চাইত। তবে এ বার প্রত্যেকেই সাবেকি প্রতিমা বানানোর কথা বলেছে। সেই কারণে আমরা ডাকের সাজে দুর্গাপ্রতিমাই বানাচ্ছি।’ একই অভিজ্ঞতা অন্য মৃৎশিল্পীদেরও। পিন্টু পাল বলেন, ‘এ বারের বেশির ভাগ প্রতিমাই সাবেকি বানাচ্ছি। পুজো কমিটিগুলি এই ধরনের ঠাকুরের অর্ডার দিয়েছে।’ মৃৎশিল্পী বাপি সাহার কথাতেও একই সুর। প্রতি বছর নানা থিমে দেবীকে গড়লেও এ বার তাঁর কাছেও এসেছে সাবেকি প্রতিমার অর্ডার।

    কলকাতা ও বড় জেলা শহরে পুজোর ক’টা দিন বিপুল-বিরাট থিমের সাজসজ্জার এক কোণে দুঃখিনী হয়ে বিরাজ করেন উমা। থিমসর্বস্ব উৎসব ঘরের মেয়ের বুকে বাজে বেদনার মতো, এমনটা ভেবেই কি এ বার উদ্যোক্তাদের হৃদয় পরিবর্তন? রায়গঞ্জের এক বিগ বাজেটের পুজো কমিটির সদস্য দীপঙ্কর মোদক বলেন, ‘প্রতি বারই আমরা কোনও না কোনও থিমের উপরে ঠাকুরের অর্ডার দিতাম। তবে পাড়ার সকলের কথা মেনেই এ বার ডাকের সাজের সাবেকি প্রতিমা চাইছি।’

    অর্থাৎ মন বদলে যাচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়। এ কি শুধু পছন্দের বদল, রাজনৈতিক পালাবদলের ছোঁয়াচ, নাকি এর পিছনে রয়েছে অর্থনীতির হিসেব? পুজো কমিটিগুলির একাংশের মতে, প্রতিমা ও মণ্ডপে থিমের খরচ সামলানো সহজ নয়। তার উপরে অনুদান নিচ্ছে না অনেক কমিটি। রাজ্য সরকারের ডাকে অনুদান নেওয়ার বদলে তা না নেওয়ার হিড়িক দেখা যাচ্ছে। তাই প্রতিমার জন্য বাজেটও কমের দিকে।

    রায়গঞ্জের কুমোরপাড়া বলে দিচ্ছে, এ বার বাঙালি প্রস্তুত হচ্ছে শিকড়ে ফিরতে। শ্রমিক-কৃষক রমণীর ঘাম মুছে যাচ্ছে ঘরের মেয়ের আঁচলে। সনাতনের এই প্রত্যাবর্তন কেমন লাগছে শিল্পীদের? ভানু-বাপিরা বলেন, ‘আগে তো একচালার ঠাকুরই বেশি করতাম। মধ্যে সব কেমন বদলে গেল। সাবেকি সাজে মাকে এ বার সাজাব, বেশ লাগছে!’

  • Link to this news (এই সময়)