বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে গঙ্গা, মালদহে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত
দৈনিক স্টেটসম্যান | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বৃহস্পতিবার মালদহে বন্যা (Maldaha Flood) পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গঙ্গার জলস্তর ক্রমশ বাড়তে থাকায় রাতুয়া-১ ব্লকের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে ইংরেজবাজার ব্লকের মিলকি গ্রাম পঞ্চায়েতের খাসকোলে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। ফলে নদী তীরবর্তী এলাকার হাজার হাজার মানুষ চরম উদ্বেগেৎ মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সেচ দপ্তর সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার দুপুরে মানিকচক ঘাটে গঙ্গার জলস্তর ২৬.৫ মিটারে পৌঁছয়। যা চরম বিপদসীমা ২৫.৩০ মিটারের থেকে প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার বেশি। বিহার থেকে বিপুল পরিমাণ জল গঙ্গা দিয়ে মানিকচক ঘাট এবং ফারাক্কা ব্যারাজের দিকে আসায় নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়ছে।
রতুয়া-১ ব্লকের কাহালা এলাকার বেশ কিছু অংশ প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ ভুতনির দিয়ারা এলাকায়। উত্তর চণ্ডীপুর, দক্ষিণ চণ্ডীপুর এবং হিরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় গোটা এলাকাই জলের তলায় চলে গিয়েছে।
উদ্ধারকাজ চলছে। গত তিন দিনে বহু মানুষ নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। মালদহের ইংরেজবাজার, মানিকচক এবং রতুয়া-সহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যায় (Maldaha Flood)আক্রান্তের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৩ লক্ষ ছাড়িয়েছে।
বন্যার জেরে (Maldaha Flood) স্বাস্থ্য পরিষেবাও ব্যাহত হয়েছে। বুধবার রতুয়ার মহানন্দাটোলা হাসপাতাল জলমগ্ন হয়ে পড়ায় সেটিকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভুতনির উত্তর চণ্ডীপুরের হাসপাতালেও জলের তলায় চলে যাওয়ায় আপাতত উত্তরর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত ভবনের দোতলায় হাসপাতালটি চালু করা হয়েছে। সেখানে ১০ শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভুতনির বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে থাকা গর্ভবতী মহিলাদের উদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে মানিকচক ব্লক স্বাস্থ্য দপ্তর। স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে খবর, উত্তর চণ্ডীপুর, দক্ষিণ চণ্ডীপুর এবং হিরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় মোট ৩১২ জন গর্ভবতী মহিলা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ১৮৬ জনকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এই ১৮৬ জনের মধ্যে ৪০ জনের সন্তান প্রসব হয়েছে এবং তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আরও ৯৪ জন আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ৩০ জন রয়েছে চারটি ত্রাণশিবিরে। ত্রাণশিবিরে থাকা গর্ভবতী মহিলাদের নিয়মিত চিকিৎসা করছেন চিকিৎস ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মহিলাদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
মানিকচক ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক অভীক শঙ্কর কুমার জানিয়েছেন, আত্মীয়দের বাড়িতে থাকা মহিলাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কারও শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।
জলবন্দি এলাকায় চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নৌকাকে জল-অ্যাম্বুল্যান্স হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে মেডিক্যাল টিমও দুর্গত এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
ইংরেজবাজার ব্লকের খাসকোল রবিদাসপাড়ায় গঙ্গার ভাঙন নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। গত এক মাস ধরে সেখানে গঙ্গার ভয়াবহ ভাঙন চলছে। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি পরিবার বাড়িঘর হারিয়েছে। আরও অনেক পরিবার বাড়ি ভেঙে নিরাপদ জায়গায় চলে যাচ্ছে। অনেকে খাসকোল হাইস্কুলের ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।
বিজেপির দক্ষিণ মালদহ জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, যেভাবে গঙ্গার ভাঙন চলছে এবং জলস্তর বাড়ছে, তাতে খাসকোলে নদীর জল ঢুকে ইংরেজবাজারেও বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যার প্রভাব পড়েছে পুলিশ পরিকাঠামোতেও। ভুতনি থানা এবং আরও একটি পুলিশ ফাঁড়ি জলমগ্ন হয়ে পড়ার পর পুলিশকর্মীরা নৌকায় করে দুর্গত এলাকায় পৌঁছচ্ছেন। তাঁরা দুর্গতদের হাতে খাবারের প্যাকেট, রান্নার সামগ্রী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস তুলে দিচ্ছেন।
খাসকোলের পাশাপাশি কালিয়াচক-২ এবং স্থানীয় ভাবে পাগলাঘাট নামে পরিচিত পঞ্চানন্দপুর এলাকাতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গঙ্গার জলস্তর আরও বাড়লে নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এরই মধ্যে আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসে উদ্বেগ বেড়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। লাগাতার ভারী বৃষ্টি হলে মালদহের বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালাচ্ছে জেলা প্রশাসন। দুর্গতদের রান্না করা খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে। গঙ্গার পাশাপাশি ফুলহার নদীর জলস্তরের উপরও কড়া নজর রাখা হয়েছে। দুই নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং নতুন করে ভাঙন ও প্লাবনের জেরে (Maldaha Flood) নদী তীরবর্তী জনপদগুলিতে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।