আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিধানসভার অধিবেশন কক্ষে বৃহস্পতিবার উত্তেজনার পারদ চড়ল এক নয়া উচ্চতায়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক রাশ শক্ত হাতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে তড়িঘড়ি পাশ করানো হল ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড কলেজেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’। আর এই বিল পাশের মঞ্চ থেকেই বামপন্থা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে সরাসরি নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা করার মেজাজে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিলেন—বাম জমানার নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে পার্টি অফিসের জমি দখল, কোনও কিছুই আর ধামাচাপা থাকবে না। ৩৪ বছরের বাম আমল এবং পরবর্তী ১৫ বছরের হিসাব একসঙ্গে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেওয়ার জন্য এবার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করবে সরকার।
নতুন এই সংশোধনী বিলের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হল রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলির ক্ষমতা সরকারের হাতে তুলে নেওয়া। এত দিন কোনও স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করার রেওয়াজ ছিল না। এই ধারার যৌক্তিকতা বোঝাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আক্রমণাত্মক শ্লেষের সুরেই বিদ্ধ করেন বামপন্থী অধ্যাপকদের। তিনি বলেন, যাঁরা লেনিন, মার্ক্স কিংবা চে গুয়েভারা আওড়ে সমাজবাদ কায়েমের কথা বলেন, তাঁদের বিপুল পাণ্ডিত্যকে এবার নবগঠিত এবং পরিকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উন্নয়নে কাজে লাগানো হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (জুটা)-র নাম টেনে এনে তিনি জানান, বাম মনোভাবাপন্ন অধ্যাপকদের পুরোনো ইতিহাসও সরকারের জানা আছে এবং প্রয়োজনে তদন্ত কমিশন বসিয়ে প্রাক্তন উপাচার্য গোপাল সেন হত্যার মতো পুরোনো অধ্যায়েরও পর্দাফাঁস করা হবে।
নতুন বিল পেশ হতেই বিরোধিতার সুর চড়ায় বিরোধী শিবির। সিপিএম বিধায়ক মোস্তাফিজুর রানা থেকে শুরু করে আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকী এবং তৃণমূলের বিধায়করা অভিযোগ তোলেন, এই আইনের মাধ্যমে আদতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকার ধূলিসাৎ করে উচ্চশিক্ষাকে সম্পূর্ণ দলীয় ও গৈরিকীকরণ করার ফাঁদ পাতা হচ্ছে। সেনেট ও সিন্ডিকেটকে অকেজো করে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগও উড়িয়ে দেননি শিক্ষকমহলের একাংশ। সেই অভিযোগের জবাবে শুভেন্দুর সাফ জবাব, কর্ণাটক, কেরল বা মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যেও বদলির এই প্রথা চালু রয়েছে। তাছাড়া ইউজিসি-র নির্দেশিকা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধির তুলনায় সংসদ বা বিধানসভায় পাশ হওয়া আইনের সাংবিধানিক বৈধতা অনেক বেশি। শিক্ষার রাজনীতিকরণের অভিযোগ উড়িয়ে তাঁর পাল্টা কটাক্ষ, বাম আমলে শিক্ষায় 'অনিলায়ন' আর তৃণমূল জমানায় 'মমতায়ন' ঘটেছিল, বর্তমান সরকার কেবল পিছিয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করতে চাইছে।
যাদবপুরকে কেন্দ্র করে নিজের ঝাঁঝালো অবস্থান বজায় রেখে মুখ্যমন্ত্রী এদিন আরও এক কদম এগিয়ে হুঁশিয়ারি দেন। বিধানসভায় খবরের কাগজের ক্লিপিং উঁচিয়ে তিনি জানান, ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে যাঁরা দেশবিরোধী স্লোগান তোলেন বা বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবনা ছড়ান, তাঁদের রেয়াত করা হবে না। এক্ষেত্রে নরম নীতির বদলে চরম কড়া পদক্ষেপের পথেই হাঁটবে প্রশাসন। বিরোধীদের তোপ দেগে তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে থেকে যাঁরা পার্টির রাজনীতি করতে চান, তাঁরা চাকরি ছেড়ে 'হোলটাইমার' হয়ে 'গণশক্তি' বিক্রি করুন। পাশাপাশি বাম জমানায় গরিবের টাকা মেরে আড়াই হাজার দলীয় কার্যালয় গড়া এবং প্রভাব খাটিয়ে পরিবারের সদস্যদের ভুয়ো চাকরি পাইয়ে দেওয়ার সব খতিয়ান এবার সরকার প্রকাশ করবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।