• তসলিমা বক্তৃতা কলকাতার এবার স্কুলের প্রশ্নপত্রে
    আজকাল | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফেরার অনুমতি পেয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। গত জুলাইয়ের শেষে কলকাতায় পা রাখেন তিনি। কয়েক দিনের সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে তাঁর আবৃত্তির অনুষ্ঠান।

    আবৃত্তির আগে তসলিমার বক্তব্যে উঠে এসেছিল দীর্ঘদিন কলকাতায় ফিরতে না পারার অভিজ্ঞতা, নির্বাসনের যন্ত্রণা, মাতৃভাষার প্রতি টান এবং স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে তাঁর বক্তব্য।

    সেই ভাষণের একটি অংশ এবার জায়গা করে নিল কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলের দশম শ্রেণির মিডটার্ম পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে। শুধু পাঠ্যাংশ হিসেবে ব্যবহার করাই নয়, ওই বক্তব্যের অর্থ, অন্তর্নিহিত ভাব এবং লেখিকার বক্তব্যের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করতেও বলা হয়েছে পড়ুয়াদের।

    প্রশ্নপত্রে তসলিমার ভাষণের যে অংশটি দেওয়া হয়েছে, সেখানে নির্বাসন, নিজের ভাষার প্রতি আবেগ, স্বাধীনভাবে চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের মতো বিষয় উঠে এসেছে। পড়ুয়াদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, লেখিকা ওই বক্তব্যের মাধ্যমে কী বলতে চেয়েছেন এবং তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত ভাব কী।

    অর্থাৎ, এখানে শুধুমাত্র কোনও তথ্য মনে রাখার পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। একটি সমকালীন বক্তব্য পড়ে তার অর্থ অনুধাবন করা, বক্তার অবস্থান বোঝা এবং বক্তব্যের নির্দিষ্ট অংশের ব্যাখ্যা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। একজন লেখক কী বলেছেন, তার পাশাপাশি কেন বলেছেন এবং তাঁর বক্তব্যের ভিতরের অর্থ কী, সেটিই হয়ে উঠেছে প্রশ্নের মূল বিষয়।

    প্রশ্নপত্রের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই বিষয়টি নজরে আসে তসলিমা নাসরিনেরও। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘মজার কাণ্ড! এতদিন শুনেছি আমাকে দেশ থেকে বের করে দিতে হবে, শহর থেকে বের করে দিতে হবে, আমার বই নিষিদ্ধ করতে হবে, আমার লেখা পড়া যাবে না। এবার দেখি আমি দিব্যি দশম শ্রেণির বাংলা পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ঢুকে পড়েছি!’

    এখানেই থেমে থাকেননি তসলিমা।তিনি লিখেছেন, ‘সবচেয়ে মজার ব্যাপার, যে কলকাতা থেকে আমাকে একদিন চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল, সেই কলকাতায় আমার ফিরে আসার কথাই আজ পরীক্ষার গদ্যাংশ। জীবন মাঝে মাঝে বেশ রসিক। মানুষকে নির্বাসিত করা যায়, লেখাকে বোধহয় অত সহজে নির্বাসিত করা যায় না।’

    তসলিমার কলকাতায় ফিরে আসা নিয়ে তাঁর নিজের বক্তব্যই এবার স্কুলের পরীক্ষার আলোচ্য হয়ে ওঠায় ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই আলাদা মাত্রা পেয়েছে। কারণ, স্কুলের পরীক্ষায় সাধারণত নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের গদ্য বা কবিতা থেকেই প্রশ্ন করা হয়। সেখানে সমকালীন এক লেখকের প্রকাশ্য ভাষণের অংশ তুলে এনে তার বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে বলা হয়েছে।

    তসলিমার বক্তব্যে স্বাধীনতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়েছে। ধর্ম, সমাজ, পরিবার কিংবা রাষ্ট্র কোনও পরিচয়ের কারণে মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা খর্ব করা উচিত কি না, সেই প্রশ্ন তিনি তুলেছেন। একই সঙ্গে একজন লেখকের স্বাধীনভাবে চিন্তা করা এবং নিজের মত প্রকাশের অধিকারের কথাও বলেছেন।

    ফলে সাউছ পয়েন্ট স্কুলের এই প্রশ্নপত্র ঘিরে আলোচনাটি শুধু তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে নয়। একটি বক্তব্যকে কীভাবে পড়তে হয়, তার অর্থ কীভাবে বুঝতে হয় এবং লেখকের অবস্থানকে কীভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়, সেই শিক্ষাপদ্ধতির দিকটিও সামনে এসেছে।

    আর তসলিমার ক্ষেত্রে বিষয়টির মধ্যে রয়েছে একটি অদ্ভুত পরিহাসও। যে কলকাতা থেকে একসময় তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল, বহু বছর পর সেই কলকাতায় তাঁর ফিরে আসার অভিজ্ঞতাই এবার দশম শ্রেণির বাংলা পরীক্ষার গদ্যাংশ।

    সোশ্যাল মিডিয়ায় তাই প্রশ্নপত্রটি ছড়িয়ে পড়তেই স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে পাঠক, তসলিমা-অনুরাগী এবং বাংলা ভাষার জগতের মানুষের।
  • Link to this news (আজকাল)