ভুয়ো চিকিৎসক তৈরির কারিগর ভিন রাজ্যের মেডিকেল কলেজ!
বর্তমান | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: স্বাস্থ্যদপ্তরের চোখ খুলে দিয়েছে নবাবহাটের নার্সিংহোমে শিশুর মৃত্যু। একে একে সামনে আসে মোটা টাকা ফেললেই এমবিবিএস ডিগ্রিধারী হয়ে পুরোদস্তুর চিকিৎসক হয়ে যাচ্ছেন নার্সিংহোমের স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা ডাক্তারের অ্যাসিস্ট্যান্ট। কিন্তু, প্রশ্ন হল এই ডিগ্রি এবং রেজিস্ট্রেশন খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে কীভাবে?
তদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, ডাক্তারি রেজিস্ট্রেশন বিক্রির নেপথ্যে রয়েছে ভিন রাজ্যের কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। তাদেরকে ঢাল করেই চলছে রেজিস্ট্রেশন কেনাবেচা। টাকা খরচ করলেই ডায়ালাইসিস টেকনিসিয়ানও রাতারাতি নামের আগে ডিগ্রিধারী ডাক্তার লিখে ফেলছেন। বুক ফুলিয়ে বোর্ড ঝুলিয়ে চুটিয়ে প্র্যাকটিস করছেন। বিভিন্ন নার্সিংহোমে অপারেশন করছেন। এমনকী, মাইক্রো সার্জারির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর অপারেশনও অর্থের লোভে হাতছাড়া করছেন না। আর তাতেই ঘটছে বিপত্তি। মাইনর অপারেশন করাতে গিয়ে রোগী মারা যাচ্ছেন। দু’একদিন হইচই হচ্ছে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হচ্ছে। চাপে পড়ে কোথাও কোথাও টাকার বিনিময়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। অথচ, ভুয়ো ডিগ্রিধারী ওই ডাক্তারদের ছুঁতে পারছে কেউই। ফলত, আবারও তাঁরা পুরোদমে স্বমহিমায় ফিরে আসছেন। ধীরে ধীরে অসাধু চক্রটির এইসব কীর্তি ফাঁস হতেই আতঙ্ক বাড়ছে রোগীর বাড়ির লোকেদের। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন, কীভাবে ঠিক করবেন কে প্রকৃত চিকিৎসক আর কে ভুয়ো? সব ডাক্তারকেই তাঁরা যেন সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছেন। ফলে, প্রকৃত ডাক্তারদের সঙ্গে রোগীর সম্পর্ক ক্রমেই তলানিতে ঠেকছে। এক্ষেত্রে রোগীর পরিজনরা সঙ্গত একটি প্রশ্ন তুলছেন—স্বাস্থ্যদপ্তর ইচ্ছে করলে খুব সহজেই ভুয়ো ডাক্তারদের চিহ্নিত করতে পারেন। কিন্তু, তারা কেন হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন? এই প্রশ্ন একেবারেই অমুলক নয় বলেই মনে করছেন বিজেপি নেতা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র। তিনি বলেন, ‘সত্যিই তো, যাঁরা সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন তাঁদের তথ্য যাচাই করলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্ঘাত এই চক্রের সঙ্গে স্বাস্থ্যদপ্তরেরও কেউ না কেউ জড়িত। তা না হলে এতবড় চক্র চলতে পারে না।’
নবাবহাটের ওই নার্সিংহোমে সামান্য ফাইমোসিসের অপারেশনের পর শিশুর মৃত্যুতে চিকিৎসকদের গাফিলতি ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। স্বাস্থ্যদপ্তর তিনজনের কমিটি তৈরি করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। তবে সেই তদন্তে আদৌও আসল ঘটনা উঠে আসবে কিনা তা নিয়ে পরিবারের লোকজন সন্দিহান। স্বাস্থদপ্তরের এক আধিকারিক বলেন, ‘ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করা হবে। পরিবারের লোকজন তদন্তে সন্তষ্ট না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন।’
স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্ধমানে ভুয়ো চিকিৎসকের রমরমা বহুদিনের। অনেকে আবার রেজিস্ট্রেশন না কিনেও ডাক্তার পরিচয় দিয়ে প্র্যাকটিস করছেন। দালালদের সৌজন্যে তাঁদের রোগী পেতে সমস্যা হয় না। মুর্শিদাবাদ, বীরভূম বা দুই বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রোগীদের ওই ভুয়ো চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে আসা হয়। ভুল চিকিৎসায় কোনো রোগীর মৃত্যু হলেও জল বেশিদূর গড়ায় না। দালালরাই ফের হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। স্বাস্থ্যদপ্তরের টনক না নড়লে এই অবস্থা চলতেই থাকবে। এমনই আশঙ্কা রোগীর বাড়ির পরিজনদের।