• যাঁরা বিরোধিতা করেন, তাঁদেরও সম্মান করি: প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
    এই সময় | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • অন্য সময় প্রাইম: নানা ব্যস্ততার মাঝে আপনি কেমন আছেন?
    প্রসেনজিৎ: ভালো আছি। আমি বরাবরই নিজের কাজের দিকে মন দিতে পছন্দ করি। ভালো কাজ কিছু হলে সবাই সেটাকে ভালোবাসেন, সেটাই আমার কাছে বড় কথা।

    অন্য সময় প্রাইম: ‘ডাক্তার কাকু’ ছবিতে কাজ করার বিশেষ কোনও কারণ?
    প্রসেনজিৎ: আমি আসলে বরাবরই খুব আবেগপ্রবণ মানুষ। অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শিকড়গুলো নিয়ে বাঁচতে ভালোবাসি। ‘ডাক্তার কাকু’ ঠিক তেমনই শিকড়ের গল্প। আসলে এত চেনা এবং দেখা একটা চরিত্রে আমি রাজি না হয়ে পারলাম না। আমার জীবনেও ‘ডাক্তার কাকু’ এর মতো একাধিক চরিত্ররা আছেন। স্পেশালি একজনের নাম করতে আজ ভীষণ ইচ্ছা করছে। আমরা পরিবারের সকলে তাঁকে পার্থমামা বলে ডাকতাম। উনি আমাদের হাউস ফিজিশিয়ান ছিলেন, তাঁর হাতেই আমার বোন জন্মেছিল। ছোট থেকে মাঝ বয়স অবধি সব ক্ষেত্রেই তাঁকে পেয়েছি, অভিভাবকের মতো। মায়েরা ভাইফোঁটা দিতেন। আজকের দিনে হয়তো এই সব আবেগগুলো কিছুটা কমে গিয়েছে। মনে আছে ছেলে মিশুক (তৃষাণজিৎ চট্টোপাধ্যায়) হওয়ার সময়ে আমি শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলাম, তখন দায়িত্ব নিয়ে অর্পিতাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলেন উনি।

    অন্য সময় প্রাইম: সময়ের সঙ্গে চিকিৎসক এবং রোগীর সম্পর্কেও তো অনেক পরিবর্তন এসেছে। সেটা কী ভাবে দেখেন?
    প্রসেনজিৎ: সময় বদলেছে, যোগাযোগের ধরন বদলেছে, গোটা কাঠামোও বদলেছে। এখন অনেক কিছুই কর্পোরেট ব্যবস্থার মধ্যে এসেছে। এর যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনই নেতিবাচক দিকও রয়েছে। তবে আমি মনে করি, ১০০ জনের মধ্যে দু’-একজনের উদাহরণ দিয়ে গোটা পেশাকে বিচার করা ঠিক নয়। আর আমার ব্যক্তিগত ভাবে একটা খারাপ লাগার জায়গা, আজকাল ভালো কাজের কোনও প্রচার নেই, বরং মানুষ শুধু নেগেটিভটাই খুঁজে বের করেন।

    অন্য সময় প্রাইম: আপনার ছেলে মিশুক নতুন প্রজন্মের মানুষ। সম্পর্কের সমীকরণগুলো কি তাঁকে বোঝাতে পেরেছেন?
    প্রসেনজিৎ: ওকে সব সময়ে বলেছি, যে পেশাই বেছে নাও, নিজের মতো করে কাজ করো। কোথায় সফল হবে, সেটা আমি জানি না। কিন্তু মানুষ হিসেবে ভালো থাকার চেষ্টা করো। ও মানুষ হিসেবে খুব মাটির কাছাকাছি থাকা একজন। গাড়িতে যেতে বললে অনেক সময়ে বলে, গাড়িতে যাব না, অটোয় যাব। জীবনে লড়াই করতে হবে— এই কথাটা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এটার জন্য অর্পিতার কৃতিত্বই বেশি।

    অন্য সময় প্রাইম: এত বছর ধরে অভিনয় করছেন। আপনার কাছে এখন সাফল্যের সংজ্ঞাটা কী?
    প্রসেনজিৎ: আমি পাঁচ বছর বয়স থেকে অভিনয় করছি, এখন আমার বয়স ৬০-এর বেশি। আমার কাছে অভিনয় একটা পেশা। কিন্তু মানুষ যেন আমাকে মানুষ হিসেবেই মনে রাখেন, সেটা হবে বেশি আনন্দের। কতগুলো ছবি করেছি, কতটা কাজ করেছি— তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ আমি মানুষ হিসেবে কেমন ছিলাম।

    অন্য সময় প্রাইম: বাংলা সিনেমার বর্তমান পরিস্থিতি কি আদৌ আশানুরূপ?
    প্রসেনজিৎ: আমি খুব অনেস্টলি একটা কথা বলতে চাই। দীর্ঘদিন এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার পরে বলতে দ্বিধা নেই যে, এখন যা ছবি হচ্ছে তার কনটেন্টের মান আঁতকে ওঠার মতো। একটা ভুল পারসপেক্টিভে মানুষ যা নয় তাই বলে যাচ্ছেন। যাঁরা ক্রিটিসিজ়ম করছেন, আমি নিশ্চিত তাঁরা ছবি না দেখে করছেন। যাঁরা বক্স অফিস নিয়ে কথা বলেন, তাঁরা ইকোনমিক্যালি হিসাবটা করেন না। একজন ইকোনমিস্টকে বসিয়ে দিলে অঙ্কটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, আমাদের বাংলা ইন্ডাস্ট্রি এগিয়ে না পিছিয়ে রয়েছে। আমি হলফ করে বলছি, অল ইন্ডিয়ার নিরিখে আমরা এগিয়ে আছি। মারাঠি, ওডিয়ার মতো ছোট ইন্ডাস্ট্রির ইনভেস্টমেন্ট ওয়াইজ রিটার্নের নিরিখে হিসাব করলে অবশ্যই বাংলা ইন্ডাস্ট্রি এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু সেই সব প্রচার করার বা এই নিয়ে কথা বলার কেউ নেই। আমি সত্যিই দেখতে চাই আগামী পাঁচ-সাত বছরে আবারও পুরোনো দিনগুলো ফিরে আসুক। যখন প্রডিউসারদের টাকাটা শুধুমাত্র হল থেকেই উঠে আসতো। একটা সময়ে গোটা গ্রাম বাংলায় আমরা কয়েকজন যা ছবি করেছি, তাতে হিন্দি ছবি ঢোকার সুযোগই পায়নি। আজও আশির দশকের বাংলা ছবির সাফল্য নিয়ে আলোচনা হয়। সেটা দেখলেও যেমন ভালো লাগে।

    অন্য সময় প্রাইম: পর্দার বাইরে হোক কিংবা মধ্যে, প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার মন্ত্রটা কী?
    প্রসেনজিৎ: হ্যাঁ, মন্ত্র তো বটেই। ছোট থেকেই আমি একটা জিনিস শিখে নিয়েছিলাম, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যদি কখনও মনে হয় আমি এক শতাংশও নিজের জায়গা থেকে সরে গিয়েছি, তা হলে আমি কাজ করব না। ব্যক্তিগত জীবনের যে ওঠাপড়াই আসুক না কেন, যদি আমি আমার সম্পূর্ণটা দিয়ে দর্শকদের জন্য ক্যামেরার সামনে, পরিচালকের সামনে দাঁড়াতে না পারি তবে সেখান থেকে আমি সরে আসি। যেমন আমার প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পরে টানা আড়াই বছর আমি কোনও কাজ করিনি। কারণ জানতাম, আমি আমার সম্পূর্ণটা দেওয়ার অবস্থায় নেই। তাই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম। আজ এই জায়গায় পৌঁছতে গিয়ে ব্যক্তিগত অনেক কিছুই স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে। আর তাতে আমার কোনও আফসোস নেই। জীবনে নানা খারাপ সময় এসেছে, অনেক কিছু হারিয়েছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে চলতে হয়। যাঁরা আমার বিরোধিতা করেন, তাঁদেরও আমি সম্মান করি। জীবন থেকেই তো শিখতে হয়।

    অন্য সময় প্রাইম: এখন সিনেমার সাফল্য কি খুব অল্পেই উদ্‌যাপন করা হয়?
    প্রসেনজিৎ: ২৫ দিন ৫০ দিনের সেলিব্রেশন শুনতে আমার একটু কানে লাগে। কারণ এক সময়ে ২৫ সপ্তাহ বা ৫০ সপ্তাহটা কোনও ব্যাপার ছিল না। তবে অন্য একটা দিকও রয়েছে। একটা সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা টেকনিশিয়ান, কলাকুশলীরা খুব আশা নিয়ে কাজটা করেন, তাঁদের মধ্যে সেই উদ্যম জিইয়ে রাখতে যদি নিজেদের মতো করে সাফল্য উদ্‌যাপন করা হয়, তাতে তো ক্ষতি কিছু নেই।

    অন্য সময় প্রাইম: এতকিছু প্রাপ্তির পরেও কি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় কিছু হারাবার ভয় পান?
    প্রসেনজিৎ: হ্যাঁ, এখনও আমি সম্মান এবং ভালোবাসা হারানোর ভয় পাই।
  • Link to this news (এই সময়)