• ঝড়ে মাটিতে মিশে গিয়েছে বাড়ি, প্রতিভাবান রূপচাঁদের ভাঙা ঘরই কি বাংলার ফুটবলের প্রতিচ্ছবি?
    এই সময় | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ঝড়-বৃষ্টি কারও কাছে হয়তো নিছকই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কিন্তু রূপচাঁদ টুডুদের কাছে তা ঘর হারানোর, স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার নির্মম বাস্তবতা।

    যে বয়সে চোখজুড়ে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সেই ১৯ বছর বয়সেই রূপচাঁদ টুডুর সামনে জীবনের কঠিনতম বাস্তবতা। ঝাড়গ্রামের গোপীবল্লভপুর থানার অন্তর্ভুক্ত হাতিমারা গ্রামের এই তরুণ ফুটবলার কলকাতা ময়দানে ছুটছেন নিজের স্বপ্নকে সযত্নে লালন করতে করতে। স্বপ্ন — একদিন মোহনবাগানের জার্সি গায়ে চাপাবেন, বড় মঞ্চে খেলবেন, নিজের পরিচয় তৈরি করবেন। আর সেই ফুটবলই একদিন বদলে দেবে তাঁর পরিবারের জীবন, মুছে দেবে অভাবের দীর্ঘ অন্ধকার — এই আশাতেই প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করে চলেছেন রূপচাঁদ।

    কিন্তু স্বপ্ন যতটা সুন্দর, সেই স্বপ্নের পথে রূপচাঁদের লড়াইটা ততটাই কঠিন। অভাবের সংসার তাঁদের। সামান্য কিছু জমি রয়েছে। সেই জমিতে চাষ করেই কোনও রকমে সংসার চালান তাঁর বাবা। মা গৃহবধূ। জীবনের প্রয়োজন মেটাতেই যেখানে প্রতিদিন হিসাব কষতে হয়, সেখানে ফুটবল খেলার স্বপ্ন দেখাটাই যেন বিলাসিতা। তবু সেই অভাবের ঘর থেকেই স্বপ্ন দেখতে শিখেছেন রূপচাঁদ। ফুটবলকে আঁকড়ে ধরে কলকাতা ময়দানে নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

    কিন্তু এ বার সেই স্বপ্নের আশ্রয়টুকুও আর নেই। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই ঝড়-বৃষ্টির তাণ্ডবে ভেঙে পড়েছে রূপচাঁদদের বাঁশ-খড়ের এক চিলতে বাড়ি। মুহূর্তের ঝড়ে উড়ে গিয়েছে চাল, ভেঙে পড়েছে দেওয়াল। যে ঘরটা ছিল তাঁদের সংসারের শেষ আশ্রয়, সেটাই মিশে গিয়েছে মাটির সঙ্গে। মাথার উপর ছাদ হারিয়ে কার্যত ঘরছাড়া গোটা পরিবার।

    খবর পেয়ে কলকাতা থেকে ছুটে যান রূপচাঁদ। কিন্তু নিজের বাড়িতে পৌঁছে যে ছবি তাঁর চোখের সামনে ধরা পড়ে, তার জন্য হয়তো কোনও ভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না ১৯ বছরের ছেলেটি। ভাঙা বাঁশ, ছড়িয়ে থাকা খড়, মাটিতে লুটিয়ে পড়া ঘরের অংশ— নিজের চোখের সামনে যেন ভেঙে পড়তে দেখলেন নিজের বাড়িটাকে। আর সেই বাড়ির সঙ্গে কি একটু একটু করে ভেঙে পড়ছিল তাঁর স্বপ্নও?

    মাঠে প্রতিপক্ষকে সামলানো যায়। কঠিন পরিস্থিতিকে ট্যাকল করে আবার উঠে দাঁড়ানো যায়। গোল মিস হলে পরের সুযোগের অপেক্ষা করা যায়। কিন্তু মাথার উপর থেকে ছাদটাই যখন সরে যায়, তখন ১৯ বছরের একটা ছেলে কী করে লড়বে?

    কী করবেন, কোথা থেকে শুরু করবেন — কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না রূপচাঁদ। পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ এক দিকে, অন্য দিকে নিজের ফুটবল কেরিয়ার। এমন পরিস্থিতিতে তখন তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একটা ভরসার হাত। আর সেই হাতটাই বাড়িয়ে দিলেন ময়দানের ‘নবাব’।

    বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ালেন নবাব

    ইউনাইটেড স্পোর্টসের নবাব ভট্টাচার্য বরাবরই প্রতিভাবান ফুটবলারদের পাশে থেকেছেন। রূপচাঁদের বিপদের খবর তাঁর কাছে পৌঁছতেই এক মুহূর্ত দেরি করেননি। নতুন করে বাড়ি তৈরির জন্য আর্থিক সাহায্য পাঠিয়ে দেন তিনি। রূপচাঁদের কথাতেই ধরা পড়ে সেই মুহূর্তের অসহায়তা। তিনি বলেন, ‘গ্রামে এসে দেখি, পুরো বাড়ি ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তখন নবাবদা পাশে দাঁড়ায়। দাদার পাঠানো টাকাতেই কোনও মতে প্লাস্টিক কিনে থাকার মতো বন্দোবস্ত করি। নয়তো গৃহহীন হয়ে পড়েছিলাম।’ রূপচাঁদের কাছে এটা ছিল ভেঙে পড়ার মুহূর্তে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই।

    গোপীবল্লভপুর এক নম্বর ব্লকের শাশড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান বীরেন দোলোই বলেন, ‘বিষয়টি জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব। ব্লক প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের পক্ষে যা করণীয়, অবশ্যই করা হবে।’

    ফুটবল ছাড়েননি, স্বপ্নও নয়

    রূপচাঁদের জীবন যে শুধু বাড়ি হারানোর গল্প, তা নয়। এর আগেও অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। উচ্চ মাধ্যমিকের পরে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু অর্থের অভাবে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। জীবনের প্রয়োজন তাঁকে বার বার পিছনে টেনে ধরেছে। তবু ফুটবল ছাড়েননি রূপচাঁদ।

    মূলত ইউনাইটেড স্পোর্টসের বয়সভিত্তিক দলে খেলেন তিনি। এ বার কলকাতা লিগে রাজস্থান ইউনাইটেডের হয়ে মাঠে নেমেছেন। একটা জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। কারণ তাঁর কাছে ফুটবল শুধু একটা খেলা নয়। এই ফুটবলই হয়তো একদিন তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে অভাবের জীবন থেকে বের করে আনতে পারে। আর সেই আশাতেই প্রতিদিন মাঠে নামেন রূপচাঁদ।

    কিন্তু তাঁর গল্পটা এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই উঠে আসে আরও বড় একটা প্রশ্ন। কলকাতা লিগের পর রূপচাঁদদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

    কলকাতা লিগে বাংলার ছ’জন করে ‘ভূমিপুত্র’ ফুটবলারকে খেলানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগের পর কী? লিগ শেষ হলে রূপচাঁদদের মতো তরুণ ফুটবলাররা যাবেন কোথায়? তাঁদের পরের ধাপটা কে তৈরি করবে?

    বাংলায় ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার কোনও অভাব নেই। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের লড়াই এখনও বাঙালির আবেগের বড় অংশ। কলকাতা ময়দানে এখনও প্রতিভার অভাব নেই। গ্রামের মাঠ থেকে, প্রত্যন্ত এলাকার ঘর থেকে এখনও রূপচাঁদের মতো ছেলেরা স্বপ্ন নিয়ে বেরিয়ে আসেন। তবু একটা পর্যায়ের পরে তাঁদের অনেকেই হারিয়ে যান।

    দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে মিজ়োরাম, দক্ষিণ ভারত-সহ বিভিন্ন রাজ্যের ফুটবলাররা জায়গা করে নিচ্ছেন। অথচ বাংলার ফুটবলারদের সংখ্যা সেখানে হাতেগোনা। কেন?

    সমস্যাটা কি প্রতিভার অভাবে? নাকি প্রতিভা খুঁজে বের করার পর তাকে ধরে রাখার, পরিচর্যা করার এবং সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থাটাই যথেষ্ট নয়?

    রূপচাঁদের বাড়ির ছাদ ভেঙে পড়ার ছবিটা তাই শুধু একটি পরিবারের দুর্দশার ছবি নয়। এই ছবি বাংলার ফুটবলের তৃণমূল স্তরের বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে আসে। যে ঘর থেকে ভবিষ্যতের ফুটবলার তৈরি হতে পারে, সেই ঘরটাই যদি অভাবে ভেঙে পড়ে, সেই ছেলেটার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখবে কে?

    ‘চারাগাছগুলোর যত্ন নিতে হবে’

    নবাব ভট্টাচার্যের কথায় যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা। তাঁর দাবি, ‘ভারতীয় ফুটবলের আগামী দিনের তারকারা এই সব পরিবেশ থেকেই উঠে আসে। যারা ভারতীয় ফুটবলের উন্নতি নিয়ে আলোচনা করেন, ভারতীয় ফুটবলের এই ছবিটা তাঁদের জন্যই। বড় গাছের উপরে সার-জল দিয়ে ফলন বাড়বে না, চারাগাছের যত্ন নেওয়া দরকার।’

    কথাটা শুধু রূপচাঁদের জন্য নয়। বাংলার অসংখ্য তরুণ ফুটবলারের জন্য। আলোয় থাকা তারকাদের নিয়ে কথা বলা সহজ। বড় ম্যাচ, বড় ক্লাব, বড় নাম — সেখানেই চোখ থাকে সকলের। কিন্তু সেই তারকাদের তৈরি হওয়ার আগের গল্পটা কত জন জানেন? গ্রামের কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে, অভাবের সংসার থেকে, কখনও খালি পায়ে বা জীর্ণ জার্সিতে যে ছেলেটা মাঠে নামে, তার লড়াইটাই তো আসলে শুরু।

    রূপচাঁদের বাড়ি ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। কোনও মতে প্লাস্টিক টাঙিয়ে আপাতত মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু তাঁর স্বপ্নটা এখনও ভাঙেনি। এখনও তিনি কলকাতার মাঠে মাঠে দৌড়চ্ছেন। এখনও মনে মনে মোহনবাগানের জার্সিটা দেখছেন। এখনও বিশ্বাস করেন, একদিন ফুটবলই তাঁর পরিবারের জীবনের ছবিটা বদলে দিতে পারে।

    প্রশ্ন শুধু, সেই দিনটা আসার আগেই কি তাঁর মতো আরও অনেক প্রতিভাকে বাস্তবের ঝড় উড়িয়ে নিয়ে যাবে?

    কারণ, একটা বাড়ি ভেঙে পড়লে শুধু বাঁশ-খড়ের কাঠামোটা মাটিতে মিশে যায় না। কখনও কখনও তার সঙ্গে চাপা পড়ে যায় একটা পরিবারের স্বপ্নও।

    আর সেই স্বপ্নগুলোকে যদি সময় থাকতে ধরে না রাখা যায়, তা হলে একদিন হয়তো বাংলার ফুটবল পিছন ফিরে দেখবে— রূপচাঁদের মতো কত প্রতিভা ছিল, যাঁরা আলোয় পৌঁছনোর আগেই অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে।
  • Link to this news (এই সময়)