জামশেদপুরের ব্যবসায়ী নিখর সবলোক (৩৫) খুনে জড়িত সন্দেহে কলকাতা পুলিশের বেলেঘাটা ট্র্যাফিক গার্ডের সার্জেন্ট অয়ন গুপ্ত এবং ওই ট্র্যাফিক গার্ডেরই মহিলা সিভিক ভলান্টিয়ার টুইঙ্কল দাসকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করল ঝাড়খণ্ড পুলিশ। অয়নের বাড়ি পর্ণশ্রী এলাকায়। টুইঙ্কলের বাড়ি চাউল পট্টি রোডে। খুনের ঘটনায় ইতিমধ্যেই ঝাড়খণ্ড পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের ছয় দুষ্কৃতীকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া দুষ্কৃতীদের একাংশের সঙ্গে কলকাতা পুলিশের ওই সার্জেন্ট ও সিভিক ভলান্টিয়ারের যোগাযোগ রয়েছে বলে ঝাড়খণ্ড পুলিশের অভিযোগ। এক দুষ্কৃতীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার লালবাজারে কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তরে সার্জেন্ট ও সিভিক ভলান্টিয়ারকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে সূত্রের খবর। কথায় অসঙ্গতি থাকার কারণে শুক্রবার তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ঝাড়খণ্ড পুলিশ জানিয়েছে, জামশেদপুর থেকে রাঁচি যাওয়ার রাস্তার ধারে 'হোটেল টেনথ মাইলস্টোন'-এর সামনে ২৪ অগস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হন ব্যবসায়ী নিখর সবলোক (৩৭)। তাঁকে সাত রাউন্ড গুলি করা হয়। গুলি লাগে তাঁর গলায়, কাঁধে ও পিঠে। তিনি জামশেদপুরের কদমা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। ঝাড়খণ্ডের সরাইকেলা-খরসওয়াঁ জেলার কান্ডেরবেরা-আসানবনি রোডের ধারে পিঞ্জরা পাহাড়িয়া এলাকায় সাড়ে তিন একর জমি নিয়ে দুষ্কৃতীদের দুই গোষ্ঠীর বিবাদের জেরে তিনি খুন হন বলে জানিয়েছে জামশেদপুর পুলিশ। খুনের দু'দিন আগে থেকে তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তাঁকে খুন করতে উত্তরপ্রদেশের সুলতানপুরের দুই শার্প শুটারকে ২০ লক্ষ টাকা সুপারি দেওয়া হয়েছিল। খুনের ছক কষা হয়েছিল দুমকা জেল থেকে।
সূত্রের খবর, খুনের পরেই জামশেদপুরের সিনিয়র পুলিশ সুপার এতেশাম ওয়াকারিবের নেতৃত্বে SIT গঠন করা হয়। বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় ছয় জনকে। তাদের নাম অশোককুমার সিং ওরফে রাঘব, সুশীল রজক, রীতেশ সিং, সুশীল কেরাই, রাজাকুমার সিং ওরফে শুটার সিং এবং অঙ্কিত সিং। উদ্ধার হয় খুনের জন্য ব্যবহৃত গাড়ি, দু'টি পিস্তল, সাত রাউন্ড কার্তুজ ও ছয়টি মোবাইল ফোন।
পুলিশ জানায়, যে দুই শার্প শুটারকে খুনের সুপারি দেওয়া হয়েছিল, তারা জামশেদপুরের কদমার এক গোপন ডেরায় থেকে বেশ কিছু দিন ধরে নিখর সবলোকের উপরে নজর রাখছিল। নিখরের বাড়ি জামশেদপুরের কদমা বিজয়া হেরিটেজ ফেজ-৬ এলাকায়। তার আশপাশেই থাকত শুটাররা।
কী ভাবে খুন?
২৪ অগস্ট দুপুরে রীতেশ সিং আততায়ীদের জানিয়ে দেয়, 'হোটেল টেনথ মাইল স্টোন' -এ রয়েছেন নিখর ও তাঁর কয়েকজন পরিচিত ব্যবসায়ী। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই হোটেলের সামনে গাড়ি চালিয়ে আসে সুনীল রজক। গাড়িতে ছিল উত্তরপ্রদেশের শার্প শুটার সাগর সিং ওরফে শিবু এবং তার সঙ্গী অঙ্কিত সিং। নিখর হোটেল থেকে বেরোতেই শিবু ও অঙ্কিত নিখরকে লক্ষ্য করে একনাগাড়ে গুলি ছুড়তে শুরু করে। নিখর মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আততায়ীরা গাড়িতে চেপে পালিয়ে যায়। নিখরকে জামশেদপুরের হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁর সঙ্গে থাকা বন্ধুরাই। হাসপাতালে চিকিৎসা চলাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়। একযোগে তদন্ত নামে আদিত্যপুর, সরাইকেলা, এমজিএম, মানগো, বিষ্টুপুর, চান্ডিল, কাপিলা, চৌকা, নিমডিহি, ইছাগড়, রাজনগর, ওলিডি, গামহারিয়া থানার পুলিশ।
তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ, একাধিক মোবাইল ফোনের কল ডিটেলসের সূত্রে পুলিশ অশোক সিং ওরফে রাঘব নামে এক দুষ্কৃতীকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের দাবি, জেরায় অশোক জানিয়ে দেয়, কী কারণে ও কী ভাবে নিখর সবলোককে খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে পুলিশ জানতে পারে জামশেদপুর ও তার লাগোয়া এলাকায় ক্রিমিনালদের সিন্ডিকেট কী ভাবে সক্রিয়।
পুলিশের দাবি, জেরায় অশোক সিং জানায়, নিখর খুনের পিছনে রয়েছে গ্যাংস্টার বিক্রম শর্মা খুনের বদলা। চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেহরাদুনে খুন হয়েছিল কুখ্যাত গ্যাংস্টার গণেশ সিং। তাকে খুন করেছিল জামশেদপুরের মানগো এলাকার গ্যাংস্টার গণেশ সিং। বিক্রম খুন হওয়ার পরে অশোক সিং ওরফে রাঘবকে জমিজায়গার অবৈধ ব্যবসা, প্রোমোটিং, তোলাবাজি-সহ একাধিক কাজের তদারকি করার দায়িত্ব দেয় অখিলেশ সিং। অখিলেশ দুমকা জেল থেকেই সেই নির্দেশ দিয়েছিল বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ জানায়, ২০২১ সালে জেল থেকে বেরিয়ে অশোক সিং সেই দায়িত্ব পালন করতে শুরু করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে সে ব্যবসায়ীদের হুমকি দিতে শুরু করে। বিক্রমের সঙ্গে একসঙ্গে বসে অশোক ব্যবসায়িক গোলমাল মেটাতে শুরু করে। তাদের কাজে বাধা দিতে শুরু করে গণেশ সিংয়ের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী নিখর সবলোক এবং মনু সিং। কয়েক মাস আগে অখিলেশের গোষ্ঠীর সঙ্গে গণেশ-নিখর গোষ্ঠীর বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। সেই সময়েই জেল থেকে অখিলেশ অশোককে নির্দেশ দেয়, নিখরকে খুন করতে হবে।
পুলিশ জানায়, স্থানীয় শুটাররা নিখরকে খুন করার অনেক চেষ্টা করেছিল। তারা ব্যর্থ হওয়ার পরে অশোকের ঘনিষ্ঠ সিন্টু সিং ও সুনীল রজক যোগাযোগ করে উত্তরপ্রদেশের শার্প শুটার সাগর সিং ওরফে শিবুর সঙ্গে। শিবু ও তার সঙ্গী অঙ্কিতকে ২০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় নিখরকে খতম করতে। অগ্রিম দেওয়া হয় ৫ লক্ষ টাকা। ওই টাকায় শিবু ও অঙ্কিত জামশেদপুরে ডেরা বেঁধে নিখর খুনের রেকি শুরু করে। পুলিশ জানায়, ধানবাদের ডেপুটি মেয়রনীরজ সিংকে একে-৪৭ রাইফেল দিয়ে খুনের অভিযোগ রয়েছে শুটার শিবুর বিরুদ্ধে।
পুলিশ জানায়, রেকি শুরু করার আগে ব্যবসায়ী নিখরের ফেসবুক থেকে তার ছবি পাঠানো হয় শিবু ও অঙ্কিতকে। ২৪ অগস্ট নিখর খুনের পরে অশোক সিং কলকাতায় পালিয়ে গিয়েছিল। অশোকের সঙ্গে কলকাতা পুলিশের ট্র্যাফিক সার্জেন্ট অয়ন ও সিভিক ভলান্টিয়ার টুইঙ্কলের যোগাযোগ ছিল কি না, খতিয়ে দেখছে ঝাড়খণ্ড পুলিশ।
এক নজরে
FAQ
নিখর সবলোক কে এবং তাঁকে কীভাবে খুন করা হয়?
নিখর সবলোক জামশেদপুরের কদমা এলাকার একজন ব্যবসায়ী। গত ২৪ অগস্ট দুপুরে একটি হোটেল থেকে বেরনোর সময় তাঁকে লক্ষ্য করে শার্প শুটাররা একনাগাড়ে গুলি চালায়, যার ফলে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
কলকাতা পুলিশের কর্মীদের কেন এই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হল?
তদন্তে জানা গিয়েছে, খুনে জড়িত দুষ্কৃতীদের সঙ্গে বেলেঘাটা ট্র্যাফিক গার্ডের সার্জেন্ট অয়ন গুপ্ত এবং সিভিক ভলান্টিয়ার টুইঙ্কল দাসের যোগাযোগ ছিল। মূল অভিযুক্ত অশোক সিংকে কলকাতায় আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এই খুনের নির্দেশ কে দিয়েছিল?
পুলিশের দাবি, গ্যাংস্টার অখিলেশ সিং দুমকা জেলে বসে তার শাগরেদ অশোক সিংকে এই খুনের নির্দেশ দিয়েছিল।
খুনের জন্য শুটারদের কত টাকা দেওয়া হয়েছিল?
উত্তরপ্রদেশের শার্প শুটার সাগর সিং (শিবু) এবং তার সঙ্গী অঙ্কিতকে ২০ লক্ষ টাকার সুপারি দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৫ লক্ষ টাকা অগ্রিম হিসেবে দেওয়া হয়।
নিহত ব্যবসায়ীর সঙ্গে দুষ্কৃতীদের শত্রুতা ঠিক কী নিয়ে ছিল?
জমি-জায়গার অবৈধ ব্যবসা এবং তোলাবাজি নিয়ে গ্যাংস্টার অখিলেশ গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যবসায়ী নিখর সবলোক ও মনু সিং গোষ্ঠীর কয়েক মাস ধরে তীব্র বিরোধ চলছিল, যা শেষ পর্যন্ত এই খুনের আকার নেয়।