• বিপর্যয় হলে ভাসবে কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, সিকিমে সাকো চু-র জল নামাতে পাম্প
    এই সময় | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়, শিলিগুড়ি: দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে উত্তর সিকিমের সাকো চু হ্রদের জলস্তর কমানোর সিদ্ধান্ত নিল সিকিম সরকার। প্রতিদিনই ওই হ্রদে জলস্তর কিছুটা করে বাড়ছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ অত্যন্ত দুর্বল। ভূমিকম্প বা অন্য কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই বাঁধ ভেঙে পড়লে ফের ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে সিকিম এবং উত্তরবঙ্গের কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারে।

    সিকিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের কাছে এই মুহূর্তে রাজ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক হ্রদগুলির একটি সাকো চু। প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদে জমে রয়েছে অন্তত ২৭ কিউবিক মিলিয়ন ঘনমিটার বরফগলা জল। এর জলস্তর অন্তত ২০ মিটার নামিয়ে আনতেই পাম্প বসানোর পরিকল্পনা হয়েছে। পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছনোর সমস্যা থাকায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করেই সেই পাম্প চালানো হবে। গত জুলাইয়ে সিকিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর এই পরিকল্পনা তৈরি করে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরে পাঠিয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন মিললেই কাজ শুরু হবে।

    লাচেন থেকে হেঁটে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছতে হয় সাকো চু-তে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই হ্রদের খুব কাছেই রয়েছে থাঙ্গু গ্রাম। গ্রামের নীচে রয়েছে সেনা ছাউনিও। ফলে হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে জল নেমে এলে প্রথম ধাক্কা লাগতে পারে এই পাহাড়ি অঞ্চলে।

    আশঙ্কা আরও বড় কারণ, সাকো চু থেকে নেমে আসা জল লাচেন এবং আশপাশের একাধিক ঝোরা দিয়ে তিস্তা নদীতে গিয়ে পড়তে পারে। সেই তিস্তার পথেই রয়েছে একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। চুঙথাঙের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নতুন করে তৈরি হচ্ছে। তার নীচে আরও অন্তত সাতটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। ফলে আচমকা বিপুল জল নেমে এলে পর পর একাধিক পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

    সিকিমের এই সতর্কতার পিছনে রয়েছে ২০২৩-এর ৪ অক্টোবরের দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ বিপর্যয়। সে দিন হ্রদের বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ জলস্রোত নেমে আসে তিস্তা উপত্যকায়। শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির ক্ষতি হয়। ভেঙে পড়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। জলের তোড়ে উড়ে যায় সেনাবাহিনীর ছাউনি। সেনাদের গোলাবারুদের একটি বড় অংশ তিস্তার তলায় চাপা পড়ে যায়।

    দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদে বিপর্যয়ের আগে প্রায় ৬৫ থেকে ১৩৯ কিউবিক মিলিয়ন লিটার জল ছিল বলে অনুমান করা হয়। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পরে সেই জলের প্রায় ২৫ শতাংশ নীচের দিকে নেমেছিল। তার সঙ্গে চুঙথাঙের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ ভেঙে আরও প্রায় ৫ কিউবিক মিলিয়ন জল যোগ হয়। দুইয়ের মিলিত অভিঘাতেই বিপর্যয় ভয়াবহ আকার নেয়।

    সাকো চু-র ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি রুখতে জলস্তর কমিয়ে ফেলার ভাবনা। তবে সেই কাজে রয়েছে বড় বাধা। পাম্প চালানোর জন্য প্রয়োজন বিদ্যুৎ। হ্রদ থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে একটি পাওয়ার গ্রিড স্টেশন থাকলেও সেখান থেকে বিদ্যুৎ পৌঁছনো সহজ নয়। তাই বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে পাম্প চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দক্ষিণ লোনার্কের ক্ষেত্রে পাম্প করে জলস্তর কমানোর চেষ্টা শুরু হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই হ্রদের বাঁধ ভেঙে বিপর্যয় ঘটে।

    শুধু জলস্তর কমানো নয়, হ্রদের আশপাশের পরিস্থিতির উপরে নজরদারিও বাড়ানো হচ্ছে। দক্ষিণ লোনার্কের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে সাকো চু-র কাছে একটি আবহাওয়া কেন্দ্র বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি বসানো হবে অ্যালার্ম ব্যবস্থা। হ্রদের বাঁধে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে বা বাঁধ ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে যাতে দ্রুত প্রশাসনের কাছে খবর পৌঁছয়, সেই ব্যবস্থা করা হবে। সিকিম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের সচিব সন্দীপ তাম্বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সাকো চু-তে কোনও বিপর্যয় যাতে না ঘটে, তার জন্য সব রকম পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এখন অপেক্ষা জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদনের। সবুজ সঙ্কেত মিললেই শুরু হবে হ্রদের জলস্তর কমানোর কাজ।

  • Link to this news (এই সময়)