দুর্গা ‘পোড়ামুখী’! বাংলার শতাব্দী প্রাচীন পুজোয় মিশে অলৌকিক কাহিনি
প্রতিদিন | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুর্গা মানেই গৌরবর্ণা, সিংহবাহিনী, দশভুজা। কিন্তু ক্যানিংয়ে এমন এক দুর্গা আছেন যাঁর মুখের রং কালো। গায়ের রং তামাটে। স্থানীয়রা বলেন, ‘পোড়ামুখী’ কালো দুর্গা। প্রায় ৪৩৮ বছরের এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে অলৌকিক ইতিহাস ও নানা ব্যতিক্রমী রীতি।
এই পুজোর জন্মভূমি এপার বাংলায় নয়। ওপার বাংলার ঢাকার বিক্রমপুরের বাইনখাঁড়া গ্রামে ভট্টাচার্য পরিবারের পূর্বপুরুষরা এই পুজো শুরু করেছিলেন। তখন মা পূজিতা হতেন গৌরবর্ণা রূপেই। দেশভাগের পর ভট্টাচার্য পরিবার চলে আসেন ক্যানিংয়ের দিঘিরপাড় এলাকায়। সঙ্গে নিয়ে আসেন তাঁদের এই প্রাচীন পুজো। জনশ্রুতি, আজ থেকে প্রায় ২২০ বছর আগে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। দুর্গা মণ্ডপের পাশেই ছিল মা মনসার মন্দির। পুরোহিত আগে মনসা পুজো করে তারপর দুর্গাপুজো (Durga Puja) করতেন। একদিন মনসা মন্দিরের জ্বলন্ত প্রদীপের সলতে কাক মুখে করে নিয়ে গিয়ে ফেলে দুর্গা মন্দিরের খড়ের চালে। নিমেষে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে গোটা মন্দির ও প্রতিমা। মায়ের মুখ-সহ গোটা শরীর পুড়ে কালো হয়ে যায়।
এই ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা ভাবেন মা হয়তো রুষ্ট হয়েছেন। তাই পুজো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই রাতেই বাড়ির কর্তা রামাকান্ত ভট্টাচার্য স্বপ্নাদেশ পান। মা জানান, পুজো বন্ধ করা যাবে না। এই পোড়ারূপেই অর্থাৎ কালো মুখ ও তামাটে গায়ের রঙেই তাঁকে পুজো করতে হবে। সেই থেকেই কালো দুর্গার পুজো শুরু।
এই পুজোর রীতিও অন্য পুজোর থেকে একেবারে আলাদা। এখানে দেবীর বাঁ দিকে থাকেন গণেশ ও সরস্বতী। আর ডানদিকে থাকেন কার্তিক ও লক্ষ্মী। নবপত্রিকাও থাকে কার্তিকের পাশে ডানদিকে। অতীতে মোষ বলি হত। এখন তা বন্ধ। নবমীতে চালকুমড়ো বলি হয়। এছাড়া নবমীর দিন চালের গুঁড়ো দিয়ে মানুষের মূর্তি বানিয়ে প্রতীকী শত্রু বলি দেওয়ার রীতিও রয়েছে। এই পুজোর আরেক বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিমার কাঠামো ৪৩৮ বছরে একবারও পরিবর্তন করা হয়নি। বংশপরম্পরায় বাংলাদেশ থেকে আসা পাল বংশের শিল্পীরাই প্রতিমা গড়েন। এখন গড়েন বাসন্তী গ্রামের গৌতম পাল। মহালয়ার দিনই মায়ের কালো মুখে চক্ষুদান হয়। ওইদিনই কয়েকশো নারকেলের নাড়ু তৈরি হয়। যা পাঁচদিন ধরে মায়ের ভোগে দেওয়া হয়।
পরিবারের সদস্য রাজীব ভট্টাচার্য বলেন, “জেলায় সম্ভবত আমাদের পুজোই সবচেয়ে প্রাচীন। মায়ের গায়ের রং কালো। এমন দুর্গা আর কোথাও দেখা যায় না। আমরা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে আজও একই নিষ্ঠায় পুজো করে আসছি।”