“জল ভেঙে যে দিক দিয়ে যাচ্ছি, ফিরতে পারছি না। ফেরার সময় দেখছি গোটা এলাকা গঙ্গার ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়েছে।” বিপন্ন জনতা তো বটেই।মালদহের ইংরেজবাজার ব্লকের মিলকি অঞ্চলের খাসকোল রবিদাস পাড়ায় গঙ্গা ভাঙন এলাকা ঘুরে এমনই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বিজেপির দক্ষিণ মালদহ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায়ের। নদী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে তিনিও একমত, ভাঙন ঠেকানো না গেলে এবার মালদহ শহর ভাসবে। শুধু কি ভাঙন! বাঁধ কেটে দেওয়ার পর গঙ্গা ও ফুলহর মিলেমিশে একাকার হয়েছে।
এবারের বন্যায় জলে ভেসে মৃতের সংখ্যাও বেড়ে ২ হয়েছে। শুক্রবার ভূতনির উত্তর চণ্ডীপুরের নাজিরুদ্দিন টোলা গ্রামে অনিকুল হক নামে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর ভূতনি থানার দক্ষিণ চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাল্লিটোলা গ্রামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। এদিকে বানভাসি ও ভাঙনে বিধ্বস্ত এলাকার মোট ৮২টি স্কুলের পঠনপাঠন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে ২৩টি স্কুলে খোলা হয়েছে ত্রাণ শিবির। গঙ্গার জলস্তর ক্রমশ বেড়ে চলায় বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে রাতের ঘুম উবেছে কালিয়াচক-২ ব্লকের পঞ্চনন্দপুরবাসীর। জলমগ্ন হয়েছে গাজোলের বিদ্রোহী মোড়।
মানিকচকের ভূতনিকে দূরে থেকে দেখলে এখন মনে হয় নদীর মাঝখানে আটকে থাকা এক টুকরো ভূখণ্ড। ইতিমধ্যে ভূতনি চরের তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৫৯টি গ্রাম জলে তলিয়েছে। এখানে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ বানভাসি হয়েছেন। চরম বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে গঙ্গা। বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে ফুলহারের জলও। দুই নদী মিলেমিশে একাকার হতে মানিকচকের ভূতনির চর, রতুয়া ১ নম্বর ব্লকের মহানন্দাটোলা ও বিলাইমারি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা ভাসছে। বানভাসি হয়েছে কালিয়াচক-৩ ব্লকের কুম্ভীরার একাংশ। জল কমবে তেমন কোনও লক্ষ্যণ নেই।
জানা গিয়েছে, ফরাক্কার ১০৯টি গেট এখন খোলা। বিপদসীমার ১.৫ মিটার উপরে গঙ্গা। বিহার, উত্তরপ্রদেশ থেকে নেমে আসা জলের তোড়ে বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে রাতে ঘুম নেই মালদহের কালিয়াচক-২ ব্লকের পঞ্চনন্দপুরবাসীর। পঞ্চানন্দপুর ফেরীঘাট সংলগ্ন বাঁধে ইতিমধ্যে হালকা ফাটল ধরেছে। সেই ফাটল দিয়ে নদীর জল চুঁইয়ে পড়তে শুরু করায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ব্যবস্থা নিয়েছে সেচ দপ্তর। বালির বস্তা ফেলে নদী ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে গঙ্গার জল প্লাবিত হয়েছে পঞ্চানন্দপুর ফেরীঘাট সহ নদীর অসংরক্ষিত এলাকা। এদিকে ভূতনি থানা জলমগ্ন। থানার ভিতরে ও বাইরে জল। জল সাঁতারে থানা থেকে বেরিয়ে নৌকায় উঠে প্লাবিত এলাকার মানুষের পরিষেবা দিচ্ছেন ভূতনি থানার পুলিশ। চারদিকে জল, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ। তার মধ্যে জীবন বিপন্ন করে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার নজির গড়ছেন ওরা।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, আপাতত গঙ্গার জলে ভেসেছে মালদহ জেলার তিনটি ব্লক-মানিকচক, রতুয়া ১ এবং কালিয়াচক ৩। ইংরেজবাজার ব্লকের মিলকি অঞ্চলের খাসকোল রবিদাস পাড়ায় মারাত্মক ভাঙন মালদহ শহরবাসীর উদ্বেগের কারণ হয়েছে। একমাস ধরে খাসকোল রবিদাস পাড়া, চৌধুরী টোলা ও সামসুদ্দিন টোলা এলাকায় ভাঙন চলছে। প্রচুর মানুষ ভিটেমাটি হারিয়েছেন। রাস্তা নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক এলাকা গিলে গঙ্গা মালদহ শহরের দিকে এগিয়ে চলেছে।
অন্যদিকে, বন্যাকবলিত এলাকার উদয়পুর হাই স্কুল, ভূতনি চণ্ডীপুর হাই স্কুল, উত্তর চণ্ডীপুর হাই স্কুল, আমতলা ননীটোলা হাই স্কুল ও কাটাহা দিয়ারা হাই স্কুলের ৭৫০ জন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বিপাকে পড়েছিল। তাদের পড়াশোনা স্বাভাবিক রাখতে অনলাইন ক্লাসের বন্দোবস্ত করেছে মালদহ জেলা প্রশাসন। এই সুবিধা পাবে নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরাও। মালদহের জেলাশাসক রাজনবীর সিং কাপুর জানান, আপাতত অনলাইনের মাধ্যমে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।