সুদেষ্ণা ঘোষাল ও অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
রাজধানীর আকাশে ক্রমাগত চক্কর কাটছে ভারতীয় বায়ুসেনার টহলদারি চপার৷ সঙ্গে নজরদার ড্রোন৷ পথেঘাটে, উঁচু বিল্ডিং, হোটেল— সর্বত্র মোতায়েন সাদা পোশাকের সশস্ত্র পুলিশ, শার্প শুটাররা৷ সন্দেহজনক কোনও গতিবিধি দেখলেই অ্যাকশন। এ সব কিছুর বাইরে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এবং দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের সতর্ক চোখ ঘোরাফেরা করছে ব্রিকস সম্মেলনের মঞ্চ ‘ভারত মণ্ডপম’-এর আশেপাশের এলাকা এবং লীলা প্যালেস, তাজমহল, দ্য ললিত হোটেল–সংলগ্ন দেওয়ালগুলিতেও! কেন? ব্রিকস বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লিতে এসেছেন চিন, রাশিয়া, ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান–সহ একাধিক হাইপ্রোফাইল বিদেশি ব্যক্তিত্ব। তাঁদের এবং আয়োজক ভারত সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলে চিন ও রাশিয়া বিরোধী কোনও গ্রাফিতি যাতে এই সব দেওয়ালে আঁকা না হয়, সে দিকেই কড়া নজর দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর৷ কোনও ধরনের অপ্রত্যাশিত প্রতিবাদ–বিক্ষোভ রুখতেও চলছে কড়া নজরদারি, সক্রিয় দিল্লি পুলিশের সাইবার সেল–ও।
সূত্রের খবর, দিল্লিতে রাষ্ট্রনেতাদের সম্মেলনের প্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশের হাতে এসেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর ‘স্পেসিফিক অ্যাকশনেবল ইনপুট’৷ জানা গিয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনের মতো হাই-প্রোফাইল আন্তর্জাতিক ইভেন্ট চলাকালীন দিল্লি ও তার আশপাশের এলাকায় ‘লো-ইনটেনসিটি’ বা কম মাত্রার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে পারে পাক-মদতপুষ্ট জঙ্গিগোষ্ঠী ‘শেহজ়াদ ভাট্টি নেটওয়ার্ক’। এই গোয়েন্দা ইনপুটকে মাথায় রেখে ‘ভারত মণ্ডপম’ এবং তার আশপাশের এলাকায় চিরুনি তল্লাশি চালানো হচ্ছে৷ বাড়তি নজর রাখা হচ্ছে দিল্লি মেট্রোতেও৷ এর পাশাপাশি সম্মেলন স্থলের কাছে চিন ও রাশিয়া বিরোধী ‘ফ্ল্যাশ প্রোটেস্ট’–এর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এর আগে দিল্লির ‘ভারত মণ্ডপমে’ই আয়োজিত হয়েছিল আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই) সামিট৷ এই সামিটে আচমকাই একদল তরুণ শার্ট খুলে খালি গায়ে মঞ্চে উঠে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখান৷ তাঁদের এই ফ্ল্যাশ প্রোটেস্টের ছবি সারা বিশ্বে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল৷ বিদেশি অতিথি–অভ্যাগতদের সামনে চূড়ান্ত অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারকে৷ এই ঘটনাকে মাথায় রেখেই ব্রিকস সম্মেলনে কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ সরকারপক্ষ৷ এই কারণেই জি-২০ এবং এআই সামিটের তুলনায় এ বার ব্রিকস সম্মেলনের নিরাপত্তা আরও আঁটসাঁট করা হচ্ছে। যে কোনও ধরনের নাশকতা, ফ্ল্যাশ প্রোটেস্ট এবং আপত্তিকর গ্রাফিতি রুখতে ব্লু প্রিন্ট তৈরি করে ফেলেছে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা৷
পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনের কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও দিল্লির সাধারণ জনজীবন যাতে স্বাভাবিক থাকে, তা নিশ্চিত করতে মোদী সরকারের তরফে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে৷ আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আকবর রোড, রাইসিনা হিলস, মানসিং রোড, অশোকা রোড, ফিরোজ শাহ রোড, ইন্ডিয়া গেট, বিজয় চক, কর্তব্য পথ, চাণক্যপুরী–সহ দিল্লির যে ৩৫টি রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছে দিল্লিবাসীকে৷ বিকল্প রাস্তায় শুক্রবার থেকেই ট্র্যাফিক ডাইভারশন হচ্ছে সুনিয়ন্ত্রিত ভাবে৷ ব্রিকস সম্মেলন চলাকালীন দিল্লিবাসীর দৈনন্দিন যাতায়াতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করতে গুগল ম্যাপস এবং ম্যাপলস-এর সঙ্গে সমন্বয় বৈঠকও করেছে দিল্লি ট্র্যাফিক পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্র্যাফিক) দীনেশ কুমার গুপ্তা বলেন, ‘গুগল ম্যাপস এবং ম্যাপলস অ্যাপের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে, যাতে ট্র্যাফিক বিধিনিষেধ, পথ পরিবর্তন (ডাইভারশন) এবং বিকল্প রুট বা পথ সম্পর্কে সঠিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। দিল্লি ট্র্যাফিক পুলিশ সরাসরি এই সংস্থাগুলিকে ট্র্যাফিক ডাইভারশন সংক্রান্ত লাইভ আপডেট বা তাৎক্ষণিক তথ্য দেবে, যা তারা অবিলম্বে অ্যাপে আপলোড করতে পারবে, যাতে রাস্তায় বেরিয়ে মানুষ কোনও অসুবিধে বা বিভ্রান্তির মুখে না পড়ে।’
যদি কোনও চালক ভুলবশত বিধিনিষেধ থাকা কোনও রুটে চলে যান, তবে গুগল ম্যাপস এবং ম্যাপলস-এর লাইভ নেভিগেশন ব্যবস্থা অবিলম্বে তাঁদের নিকটতম বিকল্প রুটের দিশা দেখাবে। বিধিনিষেধযুক্ত এলাকায় অ্যাপ ক্যাবের পিক-আপ ও ড্রপ-অফের পরিষেবাও বন্ধ থাকবে। ভিভিআইপিদের চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে, দিল্লি পুলিশ অ্যাপ-ক্যাব পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছে। দিল্লির সব সরকারি ও বেসরকারি অফিস, স্কুল, কলেজ, আদালত অবশ্য শুক্রবার থেকেই বন্ধ।
দিল্লির ট্র্যাফিকে যাতে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে গাড়ি ব্যবহার না করে একটি বড় বাসে চেপে শনি ও রবি—দু’দিন ‘ভারত মণ্ডপমে’ যাবেন মোদী সরকারের মন্ত্রীরা৷ সংসদ ভবনে একত্রিত হয়ে রওনা দেবেন তাঁরা। প্রত্যেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে৷ বঙ্গ বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার শুক্রবার দিল্লিতে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতারেসকে৷ অন্য অভ্যাগতদের স্বাগত জানানোর দায়িত্ব পেয়েছেন বাকি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা।