এই সময়: পূর্ব কলকাতার রাজাবাজার, বেলেঘাটা, ক্যানাল ইস্ট রোড, মানিকতলা-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ ঘিরে এ বার বেনজির ভাবে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। মামলায় অন্তত ৪২টি বেআইনি নির্মাণকে প্রাথমিক ভাবে চিহ্নিত হওয়ার কথা আদালতকে জানানো হয়েছে। অভিযোগ, ন্যূনতম অনুমোদন ছাড়াই তৈরি এই নির্মাণগুলিতে কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। কালো টাকা সাদা করার জন্য একটি বড় চক্র এই বেআইনি নির্মাণের পিছনে রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সিবিআই মাঠে নামার পরে আগামী দিনে ইডি–ও এই তদন্তে যুক্ত হতে পারে বলে এ দিন ইঙ্গিত দিয়েছে আদালত।
শুক্রবার দীর্ঘ শুনানি এবং অতীতের একাধিক রিপোর্ট ও নথি দেখার পরে প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগে ও বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ— ‘গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। শহরে একের পর এক বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ সামনে আসছে। অথচ বহু ক্ষেত্রে নির্মাণগুলির মালিক কে, তার কোনও স্পষ্ট হদিশ নেই। সামান্যতম অনুমতিও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।’ সিবিআইকে তদন্ত শুরু করে এ নিয়ে প্রাথমিক রিপোর্ট দিতে বলেছে আদালত। বেঞ্চের আরও নির্দেশ, পুরসভা ও পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য সংগ্রহ করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হলে সিট বা বিশেষ তদন্তকারী দলও গঠন করতে পারবে সিবিআই। আগামী ১৪ অক্টোবরের মধ্যে প্রাথমিক রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে।
বেআইনি নির্মাণ রুখতে কলকাতা পুরসভার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। শুনানিতে প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চের প্রশ্ন, ‘কেন এতদিন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অনুসন্ধান করা হয়নি? বেআইনি নির্মাণ হলে পুরসভারই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।’ শুধু কলকাতা নয়, মুম্বইয়েও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে আদালত জানতে চায়, ‘বেআইনি নির্মাণ হলে পুরসভা নিজে তা ভাঙবে না কেন?’ এক্ষেত্রে পুলিশের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে আদালত স্পষ্ট করে, শহরে বেআইনি নির্মাণ বন্ধ করার ক্ষেত্রে পুরসভার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। মামলাকারী সুখেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে বর্ষীয়ান আইনজীবী মৈনাক বসু ও রাতুল দাস গোটা ঘটনার পিছনে কয়েক হাজার কোটি কালো টাকা লগ্নি হয়ে থাকতে পারে বলে অভিযোগ করেন। তাই ইডিকেও তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার আবেদন করা হয়।
এ দিন কলকাতা পুরসভার তরফে আদালতে বিস্তারিত তথ্য জমা দেওয়ার জন্য সময় চাওয়া হলে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের কড়া মন্তব্য, ‘এটা সময় নষ্ট করার একটা পদ্ধতি।’ প্রয়োজনে পুর কমিশনারকে আদালতে ডেকে পাঠানো হতে পারে বলেও জানানো হয়। আদালতের বক্তব্য, ‘সরকারি অফিসাররা বেতন পাচ্ছেন কাজ করার জন্য, কাজ না করার জন্য নয়।’
বেশ কিছুদিন আগে এই মামলা দায়ের হয়। সেই সময়েই শুনানিতে পুরসভার দেওয়া রিপোর্টে সংশ্লিষ্ট নির্মাণগুলিকে বেআইনি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে এই নির্মাণের পিছনে কারা রয়েছে, অর্থের উৎস কী এবং পুরসভা-পুলিশের কোনও গাফিলতি ছিল কি না— সিবিআইয়ের প্রাথমিক অনুসন্ধানে সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হতে পারে। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, পুলিশ–পুরসভা সব ক্ষেত্রেই সরকারি অফিসারদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে সিবিআইকে। তার আগে মামলাকারীর দেওয়া নথি, পুরসভা ও পুলিশের রিপোর্ট দেখে তদন্ত এগোতে হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণ— ‘বিপুল অঙ্কের কালো টাকা বিনিয়োগের অভিযোগ সত্যি হলে বিষয়টি শুধু পুর আইন ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও গভীর উদ্বেগের।’