• জল থইথই স্কুলে একটি ঘরেই পড়া, মিড-ডে মিল
    এই সময় | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • বাবলু সাঁতরা, চন্দ্রকোণা

    নাগাড়ে বৃষ্টি। উপচে পড়েছে পাশের জলাশয়। জল ঢুকে পড়েছে ক্লাসরুমে। একটি মাত্র ঘরে গাদাগাদি করে চলছে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস। মিড-ডে মিলও খাওয়ানো হচ্ছে সেই ঘরেই। স্কুলের জরুরি নথিপত্র বাঁচাতে ও পরিস্থিতি সামাল দিতে খোদ প্রধানশিক্ষককে জল বের করার কাজে হাত লাগাতে হচ্ছে। চকিতে এটাই নিচন্যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্ষা-চিত্র।

    শুক্রবার চন্দ্রকোণা-১ ব্লকের নিচন্যা গ্রামের ওই স্কুলে গিয়ে দেখা গেল, জলমগ্ন অফিসঘরে ইট বিছিয়ে যাতায়াত করছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। একটি খালা নিয়ে অফিসঘর থেকে জল বের করছেন প্রধানশিক্ষক।

    স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। গত প্রায় আট বছর ধরে বর্ষা এলেই সমস্যায় পড়তে হয় পড়ুয়া ও শিক্ষক শিক্ষিকাদের। নাগাড়ে বৃষ্টি হলেই স্কুলের আশপাশে জল জমে যায়। পরে তা ঢুকে পড়ে ক্লাসরুমেও। স্কুলের সামনের মাঠটি মাটি ফেলে উঁচু করায় সমস্যা আরও বেড়েছে। নিকাশি ব্যবস্থা না-থাকায় বর্ষার মরশুমে বেশ কিছুদিন জল জমে থাকে। স্কুলের ভবননটি পুরোনো। ওই জমা জলের কারণে ভবনটিরও আয়ু কমছে।

    বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্তও দফায় দফায় বৃষ্টি হয়েছে চন্দ্রকোণায়। তাতেই সমস্যা আরও জটিল চেহারা নিয়েছে। স্কুলের পুরোনো ভবনে দু'টি ক্লাসঘর ও অফিসে জল থইথই করছে। সেখানে বন্ধ রাখা হয়েছে পঠনপাঠন। তবে জল পেরিয়েই অফিসে যাতায়াত করছেন শিক্ষক শিক্ষিকারা। অফিসে রয়েছে আলমারি, জরুরি কাগজপত্র। জরুরি কাগজপত্র যাতে নষ্ট না-হয় সে জন্য স্কুলের প্রধানশিক্ষক নির্মাল্যকুমার পাত্র নিজেই থালা দিয়ে অফিসরুম থেকে থেকে জল বের করেন। পঠনপাঠন স্বাভাবিক রাখতে স্কুলের অন্য ভবনের একটি ঘরে গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করছে পড়ুয়ারা।

    স্কুলের সহকারী শিক্ষক সনাতন রায় বলেন, 'একটি ঘরে বেঞ্চ পেতে প্রি-প্রাইমারি থেকে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের একসঙ্গে ক্লাস নেওয়া সম্ভব? অথচ, নিরুপায় হয়ে সেটাই করতে হচ্ছে। সকলেরই অসুবিধা হচ্ছে। কিন্তু, উপায় কী?' স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা ৫৮ জন। প্রধানশিক্ষক, একজন সহকারী শিক্ষক ও একজন পার্শ্বশিক্ষিকা আছেন। স্কুলের বেহাল অবস্থার কারণে অভিভাবকদের অনেকেই ছেলেমেয়েকে নতুন করে স্কুলে ভর্তি করাতে চাইছেন না। ফলে দিন দিন পড়ুয়ার সংখ্যাও কমছে। প্রধানশিক্ষক জানান, ১৯৮১-তে পথচলা শুরু করে নিচন্যা প্রাথমিক বিদ্যালয়। পুরোনো স্কুল ভবনে টিনের ছাউনি ও পাঁচ ইঞ্চি দেওয়ালের দু'টি ক্লাসরুম রয়েছে। অফিসের কাজকর্মের জন্য একটি ক্লাসরুমকে ভাগ করে অফিস করা হয়েছে। ২০০৯-এ স্কুলের পাশে একটি অতিরিক্ত ক্লাসরুম তৈরি হয়েছে। স্কুলের বেহাল পরিকাঠামোর বিষয়ে ব্লক ও জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। পুরোনো ভবনটি মেরামত বা নতুন করে ভবন তৈরির জন্যও আবেদন করা হয়েছে। প্রধানশিক্ষক নির্মলকুমার পাত্র বলছেন, 'স্কুলের পিছনের জলাশয় উপচে ক্লাসরুমে জল ঢুকে পড়ে। পুরোনো ভবনটি মেরামত করেও বিশেষ লাভ হবে না। নতুন করে ভবন তৈরি করা সম্ভব হলে খুব ভালো হয়। আগের সরকারের আমলে বহু বার লিখিত ভাবে জানিয়েছি। কোনও ফল মেলেনি। নতুন সরকার এসেছে। আশা করি, তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। বর্ষায় খুব সমস্যায় পড়তে হয়। জমা জল তো আছেই, সাপখোপের ভয়ও কম নয়।'

    চন্দ্রকোণা-১ ব্লকের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক কৌশিক ঘোষ বলেন, 'ওই স্কুলের সমস্যা সম্পর্কে আমরা জানি। স্কুলের সামনে মাঠটি মাটি ফেলে উঁচু করার কারণে ভারী বৃষ্টি হলেই আশপাশের জল স্কুলে ঢুকে যায়। নিকাশির সমস্যাও রয়েছে। আগের সরকারের কাছে গ্রান্টের জন্য আবেদন করেছিলাম। নতুন সরকারের কাছেও আবেদন করা হবে।'

    অভিভাবক অরূপ চক্রবর্তীর কথায়, 'বৃষ্টি হলেই স্কুলে জল ঢুকে যায়। অনেক দিন থেকেই এই সমস্যা হচ্ছে। স্থায়ী সমাধান দরকার। পরিকাঠামোর উন্নয়ন না-হলে ছেলেমেয়েদের এই স্কুলে পাঠানো ঝুঁকির ব্যাপার।'

  • Link to this news (এই সময়)