সৌমেন রায়চৌধুরী
একটা হাসি কি যুদ্ধ থামাতে পারে? না, তবে প্রেমের কবিতা লিখে ফেলতে পারে অনায়াসে। তুফান তুলতে পারে প্রেমিকের বুকে। স্ত্রী অঞ্জলির সেই হাসিতেই ঘায়েল হয়েছিলেন ভূপতিরঞ্জন দেবনাথ। হাসলেই যে ঠোঁটের দু’ধারে টোল পড়ত।
গত ছ’মাস ধরে শয্যাশায়ী অঞ্জলি। বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে জর্জরিত শরীর। মুখের সেই চেনা হাসিও ম্লান। কিন্তু ভূপতির মনে তা একেবারে স্পষ্ট। যেন সেদিনের কথা। স্ত্রী আবার হেসে উঠবেন কি না, জানেন না ৮৮ বছরের ভূপতি। তাই হাসিটাকে ‘বাঁধিয়ে’ রাখতে চেয়েছিলেন। সেই ইচ্ছেতেই মধ্যমগ্রামের বাড়িতে নিজের হাতে গড়ে ফেলেছেন স্ত্রীর মূর্তি।
ভূপতি মধ্যমগ্রাম হাইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক। ক্লাসে ছাত্র পড়িয়েছেন মন দিয়ে। আর অবসরে হাতের কাছে যা পেয়েছেন, তা দিয়েই গড়েছেন নিজের পৃথিবী। দু’কামরার ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়বে নানা কিসিমের মূর্তি, ছবি। তবে কোনও দিন প্রচারের আলো পড়েনি তাঁর উপর। নামের সঙ্গে জড়ায়নি শিল্পী-পরিচয়। অথচ বাড়ির এক ঘর থেকে আর এক ঘর—শোকেস, তাক, দেওয়াল— ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর কাজ।
কখনও মাটি, কখনও নারকেলের খোল, কখনও গাছের ডাল। ফেলে দেওয়া সাধারণ সব জিনিসই তাঁর হাতে প্রাণ পেয়েছে। এক একটা মডেলের দিকে তাকালে মনে হবে, এই বুঝি হেসে উঠবে। আর স্ত্রীর দেবকীর মূর্তিটা তো হাসছেই।
মূর্তিটা প্লাস্টার অফ প্যারিসের। টান টান করে বাঁধা চুল, আয়ত চোখ, টিকালো নাক। আর ঠোঁটের দুই ধারে সেই হাসি। বড় মায়াময়, বড় আবেগি। ৫৯ বছরের দাম্পত্যে এই ভাবেই হাসতেন অঞ্জলি। হাসতে হাসতেই অনায়াসে সামলে রাখতেন তাঁর সংসার। অবিকল সেই হাসিই ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।
ভূপতি অবসর নিয়েছেন প্রায় ত্রিশ বছর আগে। এখন পেনশনের টাকাতেই কোনওরকমে চলে। এক ছেলে, দুই মেয়ে। ছেলেকে হারিয়েছেন করোনার সময়ে। বাড়িতে বৌমা, নাতি। কাছাকাছি বিয়ে হয়েছে দুই মেয়ের। তাঁরা মাঝেমধ্যে আসেন। খোঁজখবর নেন। কিন্তু এখন এক অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছেন ভূপতি।
তাঁর তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। তিনটিই জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট। স্ত্রীয়ের সই ছাড়া অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারছেন না। অথচ স্ত্রীর বিছানা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা নেই। কাঁপা হাতে সইটুকুও করতে পারছেন না। সমস্যার কথা বলতে বলতে গলা কেঁপে ওঠে ভূপতির। চোখের কোণে জল জমে।
ভূপতির শোকেসে শুধু মূর্তি নয়। সেখানে রয়েছে স্মৃতি, শোক, অভিমান আর ভালোবাসা। সন্ধ্যা নামলে তিনি নিজের হাতে তৈরি স্ত্রীর মূর্তির সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ বসেন। মনে পড়ে পুরোনো কথা। ভূপতিও নিজের মনে হেসে ওঠেন। মনে মনে হয়তো গেয়ে ওঠেন কবীর সুমনের সেই গান, ‘তুই হেসে উঠলেই সূর্য লজ্জা পায়/ আলোর মুকুটখানা তোকেই পরাতে চায়।’