• ‘স্যর’ খুশি হলেই দলে পদ পাকা, সুমিতের গ্রেপ্তারিতে মুখ খুললেন নেতারা
    এই সময় | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • দিগন্ত মান্না, পাঁশকুড়া

    শুধু জমি কেলেঙ্কারি নয়। দলের পদ পেতে গেলে তাঁকে খুশি করে চলতে হতো। আর এই খুশির সঙ্গে জড়িত ছিল টাকার লেনদেনও। উপযুক্ত উপঢৌকন দিলেই মিলত পদ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায় গ্রেপ্তার হওয়ার পরে তাঁর বিরুদ্ধে পূর্ব মেদিনীপুরের তৃণমূল নেতাদের একাংশ মুখ খুলতে শুরু করতেই সামনে আসতে শুরু করেছে এ সব তথ্য।

    বিধানসভা ভোটের প্রসঙ্গ তুলে জেলায় দলের সংগঠন দুর্বল হওয়ার পিছনে সুমিতকেই দায়ী করছেন তৃণমূলের পুরোনো দিনের নেতা–কর্মীরা। জানা গিয়েছে, নন্দীগ্রামে নব্য তৃণমূলের নেতারা ‘স্যর’ বলে সম্বোধন করতেন সুমিতকে। ফলে সুমিতের গ্রেপ্তারিতে তৃণমূলের আদি নেতৃত্বের অনেকেই যে খুশি তা তাঁদের মুখ খোলাতেই স্পষ্ট।

    রাজ্য রাজনীতিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাসঙ্গিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ ছায়া দীর্ঘ হতে শুরু করে তাঁর আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের। দলের একাংশে চর্চা ছিল, সুমিত রায়ের চোখ দিয়েই জেলা দেখতেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। ২০২১–এ রাজ্যে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পরে পূর্ব মেদিনীপুরে সুমিতের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। জেলায় তৃণমূলের নানা কমিটিতে সামনের সারিতে উঠে আসতে শুরু করেন অভিষেক অনুগামীরা। জানা যায়, সেই সময়ে সুমিতকে খুশি করে তৃণমূলে পদ পাওয়াটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দস্তুর। যে পথ ধরে, ২০২৫–এ প্রাক্তন মন্ত্রী সৌমেনকুমার মহাপাত্রকে জেলার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জেলা সভাপতি করা হয় সুজিতকুমার রায়কে। যদিও সুজিতকে জেলা সভাপতি হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন দলের সিংহভাগ নেতা–কর্মী। কিন্তু শুধুমাত্র সুমিত রায়ের সুপারিশের কারণেই নাকি জেলা সভাপতি হয়েছিলেন সুজিত। জানাচ্ছেন তৃণমূলের অনেকেই। নন্দীগ্রামেও দলীয় নেতৃত্বের সমান্তরাল ব্যক্তিগত সার্কেল গড়ে তুলেছিলেন সুমিত। যার প্রতিফলন দেখা যায় নন্দীগ্রামে দলের বিভিন্ন কমিটিতে। নন্দীগ্রামের নব্য তৃণমূলের নেতারা সুমিতকে ‘স্যর’ সম্বোধন করতেন।

    জমি কেলেঙ্কারি মামলায় সুমিতের গ্রেপ্তারির পরে তাঁর বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে দলে পদ পাইয়ে দেওয়ার একাধিক অভিযোগ তুলে মুখ খুলেছেন জেলার তৃণমূল নেতাদের অনেকেই। নন্দীগ্রামের তৃণমূল নেতা আবু তাহের বলেন, ‘সুমিত সংগঠনের নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতেন। নন্দীগ্রামের অনেকেই ওঁকে স্যর ডাকতেন। টাকার বিনিময়ে উনি পদ বিক্রি করতেন বলেও শুনেছি। আমার সঙ্গে ওঁর কোনও যোগাযোগ ছিল না। তবে এটা ঠিক যে, উনি নন্দীগ্রামে সক্রিয় হওয়ার পরে দলের কোনও গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে আমার জায়গা হয়নি।’ তাঁর দাবি, ‘সুমিতের মতো লোকজনের জন্যই জেলায় তৃণমূল নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।’ মুখ খুলেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী সৌমেনকুমার মহাপাত্রের স্ত্রী সুমনা মহাপাত্রও। সুমনা বলেন, ‘তৃণমূলের নব জোয়ার কর্মসূচির সময় থেকে সুমিত জেলায় অতি সক্রিয় হন। এমন ভাব নিয়ে চলতেন যেন উনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে। অনৈতিকভাবে অনেককে সেই সময় দলের নানা পদে বসিয়েছেন সুমিত।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের এক নেতার কথায়, ‘জেলায় দলের এক নেতা সুমিতকে দিয়ে নিজের পছন্দমতো পুলিশ অফিসারদের বদলি করাতেন। এর জন্য মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেন হতো। সুমিত বহু দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত।’

    তবে সুমিত সম্পর্কে এত কিছু তাঁর অজানা ছিল বলে দাবি করেছেন তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী ও জেলার নেতা অখিল গিরি। তিনি বলেন, ‘আমরা সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতাম না। তাই সাংগঠনি বিষয়ে পরামর্শ করার জন্য দু’একবার সুমিত রায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। এর বাইরে কিছু জানি না।’

  • Link to this news (এই সময়)