দীক্ষা ভুঁইয়া: স্কুলে কোনও ছাত্রী দীর্ঘদিন আসছে না। বাড়ি থেকে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে কেউ তাকে উত্যক্ত করছে। সহপাঠী বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে। কোথাও শিশুশ্রম, পাচার বা নির্যাতনের আশঙ্কা। আবার কোনও কিশোরী ঋতুস্রাবজনিত সমস্যা, অপুষ্টি, অল্প বয়সে গর্ভধারণ কিংবা মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এমন সমস্যার খবর যাতে স্কুলের গণ্ডিতেই আটকে না থাকে, তার জন্য ঝাড়গ্রামে শুরু হল ‘প্রজ্ঞা’। অভিনব পদক্ষেপ ঝাড়গ্রাম জেলা প্রশাসনের।
'প্রজ্ঞা', এমন একটি শব্দ যার মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে প্রখর বুদ্ধিমত্তা বা গভীর উপলব্ধি। এসবই অর্জিত হয় অভিজ্ঞতা ও বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে। তাই স্কুল পড়ুয়াদের সঠিক পথ দেখাতে নেওয়া হবে 'প্রজ্ঞা' দিদির' সাহায্য।
এই প্রকল্পের পদ্ধতি বেশ সরল। ছাত্রী সমস্যা জানাবে, স্কুল সেটি পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজন হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ কোনও সমস্যা বড় আকার নেওয়ার অপেক্ষা না করে স্কুলস্তর থেকেই তার খবর পাওয়ার চেষ্টা করা হবে।
যদিও এর জন্য প্রতিটি স্কুলে তৈরি হবে ‘প্রজ্ঞা টিম’। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ১০ থেকে ১৫ জন ছাত্রীকে নিয়ে এই টিম তৈরি হবে। টিমের মধ্যে যে পড়ুয়া উঁচু ক্লাসের এবং বুদ্ধিদীপ্ত, এরকম একজনকে ‘প্রজ্ঞাদি’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হবে। তার কাছেই স্কুলের বাকি পড়ুয়া ছাত্রী নিজেদের সমস্যার কথা জানাবে।
তবে অনেক সময়েই দেখা যায়, বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যেখানে স্কুলে গেলেও নিজেদের সমস্যার কথা বলতে ভয় পায় বা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না ছাত্রীরা। সেরকম পড়ুয়াদের জন্য থাকছে ‘Let’s Whisper Box’। সেখানে নিজের সমস্যার কথা লিখে বক্সে ফেলতে পারবে ছাত্রীরা। যদিও একজন সিনিয়র মহিলা শিক্ষক থাকবেন মেন্টর হিসাবে। পরে এই অভিযোগ নিয়ে প্রতি মাসে ব্লক প্রতি কোনও স্কুলে বা কোনও একটি জায়গায় প্রশাসন এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক হবে। সেখানে ‘প্রজ্ঞাদি’রা কিশোরীদের কাছ থেকে পাওয়া সমস্যাগুলি তুলে ধরবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নিয়ে সমাধানের পথে এগোনোর ব্যবস্থা থাকবে।
এর আগে বাল্যবিবাহ ও পাচার রুখতে রাজ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পুলিশ এবং এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাত ধরে ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ নামে এরকমই একটি প্রকল্প চালু হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতে স্বয়ংসিদ্ধা ভাল সাড়াও ফেলেছিল। পরে পূর্বতন সরকার এটিকে সরকারিভাবে রাজ্য জুড়ে চালু করেন ঠিকই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বহু জায়গায় সেই প্রকল্পের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। যদিও 'স্বযংসিদ্ধা'র সঙ্গে 'প্রজ্ঞা'র কোনও সম্পর্ক নেই। প্রকল্পের কিছু সামঞ্জস্য থাকলেও পুরোপুরি প্রশাসনিক ভাবে কাজটি বাস্তবায়িত করা হবে।
‘প্রজ্ঞা’-র সাফল্য নির্ভর করবে স্কুলে কিশোরীরা কতটা নির্ভয়ে সমস্যার কথা এগিয়ে এসে বলতে পারেন। ঝাড়গ্রামের জেলাশাসক আকাঙ্ক্ষা ভাস্কর যদিও বলেন, “এটা কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতির আওতাতেই রয়েছে। আর সেইমতোই আমরা এই প্রকল্পটি শুরু করে দিয়েছি যাতে পড়ুয়া ছাত্রীদের পাশে প্রশাসন সরাসরি যোগাযোগ রেখে তাদের সমস্যা সমাধান করতে পারি।” তিনি আরও জানান, কিশোরীদের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা তৈরি করা এবং প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়ার সাহস বাড়ানোও ‘প্রজ্ঞা’র লক্ষ্য। প্রকল্পটি কার্যকর করতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে ।
অর্থাৎ, ‘প্রজ্ঞা’র মূল পরীক্ষা হবে একটি জায়গাতেই- স্কুলের কোনও কিশোরী সমস্যার কথা বলার পর সেই কথা কত দ্রুত প্রশাসনের দরজায় পৌঁছয় এবং বাস্তবে তার সমাধান হয়। লক্ষ্য, স্কুলপড়ুয়া কিশোরীদের জন্য এমন একটি নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে তারা নিজের বা সহপাঠীর সমস্যার কথা জানাতে পারবে এবং সেই তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছবে।