প্রয়াত ভারতীয় বংশোদ্ভূত কবি, লেখিকা, অনুবাদক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন। বয়স হয়েছিল ৮৬। বহুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন তিনি। রেখে গেলেন স্বামী রবার্ট ডাইসন ও দুই পুত্র ভার্জিল পূজারী ডাইসন এবং ইগর নীলাদ্রি ডাইসনকে। তাঁর সারস্বত চর্চার মধ্যে অন্যতম রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম নিয়ে তাঁর গবেষণা। পাশাপাশি রবীন্দ্র-অনুবাদের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১৯৪০ সালের ২৬ জুন তদানীন্তন পূর্ববঙ্গে জন্ম কেতকীর। পরে বাবার চাকরিসূত্রে কলকাতায় আসা। সেখানেই পড়াশোনা। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে রেকর্ড নম্বর পেয়ে তিনি বিএ পাস করেন। পরে ১৯৬৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। সেখান থেকেই পিএইচডি অর্জন করেন ১৯৭৫ সালে। অক্সফোর্ডেই পদার্থবিদ্যার পড়ুয়া খাস ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে পরিচয় ইংরেজির ছাত্রী কেতকীর। এরপর প্রেম ও বিয়ে। সেই সময় থেকেই নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর পদবিও ব্যবহার করা শুরু করেন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাওয়া লেখিকা। কিন্তু এরপরও মাতৃভাষার প্রতি প্রগাঢ় প্রেমে বাংলা হরফের প্রতি তিনি নতজানু থেকেছেন আজীবন।
১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বল্কল’। সারা জীবনে প্রকাশিত হয়েছে ৬টি কাব্যগ্রন্থ। উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম ‘নারী, নগরী’, ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’, ‘জল ফুঁড়ে আগুন’। প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ অত্যন্ত পাঠকপ্রিয় এক গ্রন্থ। লিখেছেন নাটক ‘রাতের রোদ’, ‘সুবর্ণরেখা’ প্রভৃতি। পাশাপাশি ইংরেজিও লেখালেখি করেছেন। করেছেন অনুবাদ।
কেতকীকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন সুমনা দাস সুর। কেবল গবেষণাই নয়, সম্পর্কও যেন হয়ে উঠেছিল আত্মীয়তার সূত্রে বাঁধা। ২০১৬ সালে শেষবার কলকাতায় এলে তাঁর বাড়িতেই ছিলেন লেখিকা। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানাচ্ছেন, ”বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নম্বর পেয়েছিলেন তা বহুদিন পর্যন্ত ছিল রেকর্ড। চাইলেই সারা জীবন ইংরেজিতে লিখতে পারতেন। কিন্তু বুদ্ধদেব বসুকে কথা দিয়েছিলেন বাংলা লেখা ছাড়বেন না। সেটা বজায় রেখেছিলেন আজীবন। কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস সবই লিখেছেন বাংলা ভাষায়। আবার ইংরেজিতেও কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ লিখেছেন।” তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, প্রায় একদশক আগেই দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন কেতকী। একজন সৃষ্টিশীল মানুষ এমন পরিস্থিতিতেও নিজের কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। তাঁকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছেন স্বামী রবার্ট।
২০২১ সালে করোনার প্রথম ভ্যাকসিন নেওয়ার পরপরই স্ট্রোক হয়। সেই সময় থেকেই পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। অবশেষে অক্সফোর্ডের শহরতলি কিডলিংটনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন কেতকী। রয়ে গেল তাঁর সৃষ্টির সম্ভার।